Category: গল্প
rumi-4.jpg
News Headings

খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Jan 11, 2009
Source: bdnews24.com
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
আমীরুল ইসলাম



ছোট্ট ছেলেটা-বাস করত তার দাদীমার সঙ্গে। গভীর অরণ্যে তারা থাকত। সেখানে জনমনিষ্যি নেই। বুড়ি দাদীমা বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে খাদ্য সংগ্রহ করত। দাদী ছাড়া ছেলেটির আর কেউ ছিল না। তবে একটা প্যাঁচা ছিল তার বন্ধু। তাদের কুঁড়েঘরের পাশে একটা বড় গাছ ছিল- সেই গাছের একটা গর্তে থাকত প্যাঁচাটি। গাছের পাশে গিয়ে গর্তের মুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেটি কথা বলত প্যাঁচার সঙ্গে।

একদিন প্যাঁচাটি ছেলেটিকে বলল, “ওহে আমার ক্ষুদে বন্ধু- তোমার জন্য আমার সামান্য উপহার আছে। এই নাও-”
প্যাঁচা তারপর ছোট্ট একটা কালো পাথরের নুড়ি দিল ছেলেটির হাতে।
“যত্ন করে রেখে দিও এই নুড়িটা। এটা একটা জাদুর নুড়ি। যদি কখনো তুমি বিপদে পড়ো তবে তোমার মাথার উপর নুড়িটা নিয়ে ঘোরাবে। একবার দুইবার তিনবার। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে দেখবে তোমার বিপদ কেটে যাবে। মনে রেখো এটা একটু জাদু-নুড়ি। কিন্তু সাবধান। খুব সাবধানে রাখবে এই জাদু নুড়ি।”
“বাহ্‌-ভারি চমৎকার জিনিস। নিশ্চয়ই আমি খুব যত্ন করে এটা রেখে দেব।”
কিন্তু খুব সহসাই সে কোন বিপদে পড়ল না, তাই নুড়িটা মাথার উপর ঘোরানো হলো না এবং কার্যক্ষমতা টের পাওয়া গেল না। আসলে বন্ধু প্যাঁচার এই নুড়িটা খুবই সাধারণ একটা নুড়ি। এর কোন জাদু ক্ষমতা থাকতে পারে এ ব্যাপারে খুব বেশি আস্থা পেল না ছেলেটি। কিন্তু বন্ধুর দেয়া উপহার, অবহেলা করাও ঠিক নয়। তাই ছোট একটা চামড়ার থলের মধ্যে যত্ন করে নুড়িটা ভরে সেটা সবসময় কোমরে ঝুলিয়ে রাখল। যদি কখনো বিপদে পড়ে তবে সে এটা পরীক্ষা করে দেখবে।

অন্য আরেকদিন প্যাঁচা তাকে বলল, “আশা করি নুড়িটা তুমি যত্ন করেই রেখেছো।”
“অবশ্যই। কোমরে যত্ন করে থলের মধ্যে বেঁধে রেখেছি।”, থলেটা দেখাল সে প্যাঁচাকে। প্যাঁচা তখন খুব খুশি।
“ঠিক আছে। ঠিক আছে।”
তারপর প্যাঁচা খুব মন খারাপ করে বলল, “কিছুদিনের মধ্যে আমি আমি দূরের অরণ্যে যাত্রা করব। তাই কিছুদিন আমার সঙ্গে তোমার দেখা হবে না। তবে আমি আশা করব, জাদু-নুড়ি তোমাকে সকল বিপদ থেকে মুক্ত রাখবে। টুই টুইই টুইইই.. বিদায় বন্ধু বিদায়। বিদায় বন্ধু বিদায়।”
প্যাঁচা ফরফর করে উড়াল দিল। সে যাবে গভীর অরণ্যে।
দিন যায়। মাস আসে। ছেলেটি বনে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে পাকা শিকারী হযে উঠল। দক্ষ তীরন্দাজ। তার তীর বাতাসে শোঁ শোঁ শব্দে ছুটে যায় শিকারের উদ্দেশে। অনেক দূর দূর বনে যায় ছেলেটি, বুনো হরিণের দল লক্ষ্য করে সে চলে যায় পাহাড়ের ধারে। ফিরে আসে তার প্রিয় দাদীমার কাছে।
দাদীমা তাকে একটা কথা প্রায়ই বলে থাকেন, “পুর্বদিকে তুমি যতদূর ইচ্ছা যাও কিন্তু সাবধান-পশ্চিমদিকে একবারও নয়। পশ্চিমে তুমি কখনোই যাবে না।”
দাদীমার কথা মান্য করে ছেলেটি। সে শিকারের খোঁজে শুধু পূবদিকেই যায়। কখনোই সে পশ্চিমে যাত্রা করে না। ছেলেটি ধীরে ধীরে বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে একদিন তার মনে প্রশ্ন জাগে, দাদীমাকে সে প্রশ্ন করে, “তুমি কেন পশ্চিমে যেতে আমাকে বারণ করো। কেন?”
“কারণ?”, বলে ক্ষণকাল চুপ থাকলেন দাদীমা। “কারণ পশ্চিমে আমার শত্রু বাস করে। ভয়ংকর শত্রু। সে একজন দুষ্টু জাদুকর। যদি তোমাকে দেখতে পায় তবে নিশ্চিত সে তোমাকে হত্যা করবে। যখন সে তোমাকে হত্যা করবে তারপরে সে এসে আমাকেও...”
দাদীমাকে বেশ সাহসভরে ছেলেটি উত্তর দিলো, “যদি আমি তাকে হত্যা করি তাহলে কি হবে?”
“সে একজন দুর্দান্ত জাদুকর। তুমি তাকে কিছুতেই নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। সে অনেক শক্তিশালী। অনেক ক্ষমতাবান।”
ছেলেটি দাদীমার কথা শুনে বিচলিত হলো না। বরং দর্পভরে বলল, “আমি মনে করি না যে, তোমার কোন শত্রু থাকতে পারে। তার কিছু করার ক্ষমতা থাকলে সে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত এসে ক্ষতি করে যেতো। এই জাদুকর শত্রুর সঙ্গে আমার দেখা হওয়া উচিত।”
দাদীমা আর্তনাদ করে উঠলেন, “না, না, এর কোন দরকার নেই।”
ছেলেটি আর কিছু বলল না দাদীমাকে। তবে সেই মুহূর্তেই স্থির সিদ্ধান্ত নিলো, “সে দ্রুত পশ্চিমে যাবে। এবং শত্রুকে চাক্ষুষ দেখে আসবে।”

পরদিন ভোরবেলা। তীর ধনুক কাঁধে ঝুলিয়ে প্রতিদিনের মতো খাওয়া দাওয়া সেরে দাদীমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে চলল শিকারের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে যেতে... অনেকদূর চলল সে। কিন্তু কোন শত্রুর দেখা পেল না। এমন কী কোন মানুষের দেখা মিলল না। তারপর এক দিঘির তীরে বসল সে। জলাপান করে বিশ্রাম নিতে লাগল ছেলেটা।
এমন সময় বিকট স্বরে কে যেন বলে উঠল, “আমি দেখে নেব তোমাকে। আমি দেখে দেব তোমাকে।”
ছেলেটা চারপাশে তাকালো। কোথেকে আসছে এই উচ্চকণ্ঠে ধমক।
“ঠিক আছে দেখে নিও। তবে কে তুমি? আমি তোমাকে দেখছি না। সাহস থাকলে কাছে আসো। দেখি তোমায়!”
কিন্তু একই সুরে সেই ধমক ক্রমাগত কে যেন দিয়েই যাচ্ছে, “আমি তোমাকে দেখে নেব।”
তারপরই শুরু হলো প্রচণ্ড হাসি। সেই হাসির তোড়ে পৃথিবী আর আকাশ যেন কাঁপতে লাগল। ভয়ংকর হাসি। তারপরই ধ্বনিত হলো, “এই নাও আমার উপহার।”
প্রচণ্ড ঝড়ের বেগ আছড়ে পড়লে ছেলেটার শরীরের ওপর। ছেলেটি কেঁপে কেঁপে উঠল। ছেলেটি ঘাসের গুচ্ছ ধরে সি'র থাকতে চাইল। বাতাসের তোড়ে তার পা থেকে মাথা টলমল করছে।
“কে তুমি ভীরু ? সাহস থাকলে দেখা দাও।”
আবার হা হা হাসি। তারপর দিঘির মধ্যে থেকে জলের ঘূর্ণি এসে ভিজিয়ে দিল ছেলেটিকে। জলের তোড়ে তার দমবন্ধ হবার অবস্থা।
“ভীরু, কাপুরুষ। ভীরু, কাপুরুষ। এই কি তোমার পরিচয়? এইভাবে লড়াই করা কি বীরের শোভা পায়?”
অদৃশ্য কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “আমার যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে লড়াই হবে। তুমি এখানে আসবে না। কখনোই আসবে না। আমি তীব্র এক ঝড় পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার দাদীমার ছোট্ট কুঁড়েঘরে। ব্যাপারটা নিশ্চিয়ই তোমার খুব পছন্দ হবে? এখন আশা করি তুমি আর তর্ক করবে না আমার সঙ্গে।”
“হাঁ, তোমার আচরণ আমি খুবই পছন্দ করেছি। তোমার ভীরুতাও আমি পছন্দ করেছি। আমার বাড়ির আশেপাশে প্রচুর বড় বড় পাছপালা আছে। তারা রক্ষা করবে আমার দাদীমাকে।”
“যাও, বাড়ি যাও শিগগির। দেখি কে রক্ষা করে তোমার দাদীমাকে বোকা কোথাকার যাও বাড়ি যাও।”
বলেই সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বর এবার অত্যন্ত জোরে হাসতে লাগল- “হা, হা, হা, হা, হি, হি, হি, হি। যাও বাড়ি যাও - দেখো গিয়ে অবস্থাটা।”

ছেলেটি মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল তারপর এক নিঃশ্বাসে দৌড় দিল নিজের বাড়ির দিকে। ঝড় তাকে অনুসরণ করছে। ঘুর্ণি বাতাস চারপাশে। ঝড় যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে ছেলেটিকে। ঝড়টা তীব্র থেকে তীব্রতম হয়ে উঠছে। যেন বিশাল পাথরের টুকরো উড়ে উড়ে আসছে উঁচু পাহাড় থেকে। পাথরগুলো যেন ছেলেটির চারপাশে ঘুরছে।
বাড়ির প্রবেশমুখে এসেই আবাক হলো ছেলেটি। দরজা ভেঙ্গে গেছে। ঘরটা নড়বড় করছে। আর বুড়ি দাদীমা। দরজার পাটাতন ধরে কোনমতে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে।
“তাড়াতাড়ি। তাড়াতড়ি এসো হে, বাছাধন। আমরা এখন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছি।”
দুজনেই এক সঙ্গে দৌড়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। বাতাসের তোড় কিছুতেই কমছে না। দীদামা আর ছেলেটা-দুজনকেই যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে ঝড়। ঘরটা নড়বড় করছে। যে কোন সময় ঘরটা ভেঙে পড়বে অথবা উড়ে যাবে। দাদীমা চিৎকার করছেন, “হায়রে, কেন তুমি পশ্চিমে গেলে? কেন গেলে?”
কড়কড় শব্দে এবার ঘরের মধ্যিখানটা নড়ে উঠল। ফস করে উড়ে গেল ছাদটা। দাদীমা ছাদের খুঁটি ধরে কোনমতে নিজেকে সি'র রাখার চেষ্টা করছিল। এক ঝটকায় এখন দাদীমা উড়ে গিয়ে ছাদের ভাঙা চিমনিটার গায়ে আটকে গেল। “হায়রে, মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের মৃত্যু হবে। বাঁচার আর কোন আশাই নেই আমাদের।”
তখন ছেলেটার মনে পড়ল জাদু-নুড়ির কথা। সঙ্গে সঙ্গে সে নুড়িটাকে বের করে মাথায় উপর তিনবার ঘোরালো। অমনি কোত্থেকে বিশাল একটা পাথর এসে ঘরের দরজায় আটকে গেল। ঘরটার নড়াচড়া বন্ধ হলো। ঝড়টা পাথরের সাথে কয়েকবার ধাক্কা খেয়ে স্তব্দ হলো। তারপর ঝড়টা গোঙাতে লাগল। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। একসময় নিঃশেষ হয়ে এলো ঝড়ের শক্তি।

ঝড় থেমে এল।
ঘরের দরজার সামনে বিশাল এক পাথরখণ্ড। পাথরের উপর পা দিযে ঘর থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এল ছেলেটি। ঘরের চারপাশে প্রচুর পরিমাণে গাছের ডালপালা। বড় বড় গাছও দুএকটা উড়ে এসে পড়েছে।
“বাহ! আমাদের আর কাঠের কোন অভাব হবে না দাদীমা।” খুশিতে লাফাতে লাগল ছেলেটা। তারপর দুজন মিলে আরেকটা কাঠের ঘর তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে গেল। খুব অল্পদিনেই ছেলেটা ঘর নির্মাণ করে ফেলল। কারণ ছেলেটা খুব দ্রুত কাঠ চেরাই করতে পারে। আর বড় পাথরখণ্ডটা খুব উপকারে লাগল।
নতুন করে আনন্দের সঙ্গে দাদীমা বসবাস শুরু করলেন। এই ঘরটা আরও মজবুত ও শক্তভাবে তৈরি হয়েছে।
ছেলেটি তারপর বলল, “দাদীমা, আমি আবার পশ্চিমে যাব।”
“না, না। কোন দরকার নেই। আমরা ভালোই আছি।”
“দরকার আছে। আমাদের শত্রু বেঁচে থাকবে আর আমাদের অত্যাচার করবে, এটা ঠিক নয়।”

ছেলেটি আবার দিঘির ধারে গেল। তারপর চিৎকার করতে লাগল রুদ্ধ আক্রোশে।
“ওহে ভীরু কাপুরুষ- বেরিয়ে এসো সামনে। সাহস থাকলে লড়াই করো আমার সঙ্গে।”
শুরু হলো সেই বীভৎস হাসি। স্বর্গ-মর্ত্য মাতানো হাসি। ছেলেটির চারপাশে ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সেই ভয়ংকর হাসি।
“হা হা হা। হো হো হো। এবার আমি এমন ব্রজবৃষ্টি পাঠাব যে আগে কেউ এমন ঝড় কখনো দেখেনি। প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি হবে। নিশ্চয়ই তোমার খুব পছন্দ হবে ব্যাপারটা?”
উপহাসভরে হাসতে লাগল সেই অচেনা শত্রু।
“অবশ্যই আমি পছন্দ করব। তবে আমি সবচেয়ে পছন্দ করি আক্রমণকারীদের সম্মুখে থাকা।”
“হা হা । যাও। বাড়িতে যাও। এবং শনাক্ত করার চেষ্টা করো কে তোমার আক্রমণকারী।”
ছেলেটি তীব্রগতিতে দৌড় শুরু করল বাড়ির উদ্দেশ্যে। আকাশ তখন কালো হয়ে উঠেছে। ভয়ংকর মেঘগর্জন হচ্ছে। যেন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে দিনের বেলা। কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে শিলাবৃষ্টি।


মেঘে মেঘে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আলোর ফুলকির মতো নাচছে বজ্রবৃষ্টি। সেই আলোর কণা আরও বড় হচ্ছে। ছেলেটা ছুটল তার সর্বশক্তি দিয়ে। কিন্ত ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে শিলাবৃষ্টি। ছোট ছোট শিলা। নিমেষে সেগুলো বড় বড় শিলায় পরিণত হল। ছেলেটি মাথায় হাত তুলে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করেছে কোন মতে। শরীরের শেষ শক্তিটুকু অবশিষ্ট থাকতে ছেলেটি ফিরে এলা তার বাড়ির দোরগোড়ায়। কোনমতে ঘরের ভেতর ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল।
ছেলেটি এবার আর দেরি করল না। বাইরে তীব্র শিলাবৃষ্টি। বড় বড় পাথরের টুকরো যেন আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে। মুহুর্তে বোধহয় তাদের বাড়িটা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
ছেলেটি তার কোমরে বাঁধা চামড়ার ব্যাগ থেকে জাদু-নুড়িটা বের করল। তিনবার জাদু নুড়িটা মাথার উপর ঘোরাতেই তাদের ছোট্ট কুঁড়েঘরটা পাথরের ঘরে রূপান্তরিত হল। নিরাপদে দাদীমা ও ছেলেটি বসে রইল ঘরের মাঝখানে।
বজ্র ও শিলাবৃষ্টি বারবার আঘাত করল ঘরটিতে। কিন্তু ঘরটার কোনই ক্ষতি হল না। এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঝড়বৃষ্টি থেমে এল। কিছুক্ষণ পরে পাথরের ঘরটা আবার পূর্বের মতো কাঠের ঘর রূপান্তরিত হল।
ছেলেটা দরজা খুলে বাইরে এল।
“দাদীমা এসো, দেখে যাও-” চিৎকার করে উঠল ছেলেটা।


তাদের ঘরের সামনে হাজার হাজার হীরক খণ্ড - সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। কিন্তু হীরক খণ্ডগুলো হাতে ধরার আগেই নিমেষে সেগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল।
“ওহে আমার আদরের হীরের টুকরো ছেলে, কি হয়েছে?”, জানতে চাইল দাদীমা।
“তুমি আসার সাথে সাথেই হীরক খণ্ডগুলো উধাও হয়ে গেল। ”
“বোকা ছেলে, ওগুলো আসলে শিলা। ছোট ছোট চকমকি বরফের টুকরো। সূর্যের আলোয় গলে গেছে সব।”
ছেলেটা দাদীমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করল না। সে একটু উত্তেজিত হল। সে বোকা নয়। আসলে পশ্চিমের শক্রটাই এই কাজ করেছে।
“এখনই আমি যাব পশ্চিমে। এবার আমি খতম করব শক্রকে।”, ছেলেটা চিৎকার করতে থাকে।
“না, না। শক্রকে একাই থাকতে দাও। তার শক্তি অনেক বেশি। সে তোমাকে হত্যা করবে।”
“ঠিক আছে। শক্রকে চেষ্টা করতে দাও।”, এই বলে ছেলেটা হন হন করে রওনা দিল পশ্চিম দিকে।

দীঘির ধারে পৌছাতেই সে শুনতে পেল সেই গমগমে কণ্ঠস্বর।
“আমি তোমায় দেখতে পাচ্ছি। আমি তোমায় দেখতে পাচ্ছি।”
অবাক বিস্ময়ে ছেলেটি তাকিয়ে দেখে-দিঘির মাঝখানে বিশাল বড় একটা মাথা জেগে উঠেছে। একটা মাথা কিন্তু চারদিকে চারটা মুখ। খুব ধীরে ধীরে মাথাটা ঘুরছে। আর প্রতিটা মুখ যেন বীভৎস ও কুটিল দৃষ্টিতে দেখছে ছেলেটিকে। আহ্‌ হা ! “শেষ পর্যন্ত দেখা পেলাম তোমার। এইবার তোমায় দেখে দেব আমি। দিঘির জল শুকিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করছি আমি। নিশ্চয়ই সেটা খুব পছন্দ হবে তোমার।”
“বেয়াদবের মতো কথা বলো না।”
হুংকার দিয়ে উঠল মাথাটা। মুখ চারটা ধীরে ধীরে ঘুরছে। বিশাল হাঁ করে চারটা মুখ থেকে সশব্দে ধ্বনিত হচ্ছে, “বেয়াদবের মতো কতা বলো না। বেয়াদবের মতো কথা বলো না।”
শক্রর মতো সুর করে ছেলেটা ব্যাঙ্গাত্মক কণ্ঠে বলল, “যাও, বাড়ি যাও। দ্যাখো গিয়ে বাড়ির অবস্থা।” তারপর ব্যাগ থেকে ছেলেটা সেই জাদু নুড়িটা বের করল। মাথার উপর তিনবার ঘুরালো। এবং ছুঁড়ে ফেলল নুড়িটাকে দিঘির মাছ বরাবর। নুড়িটা শোঁ করে উড়ে গিয়ে পড়ল দিঘির মাঝখানে। ছোট্ট নুড়িটা পানিতে পরেই ক্রমাগত বড় হতে লাগল। বড় বড় অনেক বড়। বিশাল এক পাথর। যেন পাহাড়ের কোন অংশ।
পাথরের স্পর্শে গরম হতে লাগল দিঘির পানি। কিছুক্ষণের মধ্যেই টগবগ করে ফুটতে লাগল দিঘির পানি। ধীরে ধীরে বাষ্প উড়তে লাগল। ছেলেটা এবার বলতে লাগল, “দিঘির পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। কেমন লাগছে তোমার? ঘরের অবস্থা কেমন?”
না, সেই মাথাটা আর দেখা গেল না। নিঃশব্দ হয়ে গেল সব। অনেক প্রশ্ন করল ছেলেটা। কিন্তু কেউ কোন উত্তর দিল না। তারপর ছেলেটি ফিরে এল তার নিজের বাড়িতে। দাদীমা হাউমাউ করে কাঁদছে। কারণ সে ভেবেছে, পশ্চিমের শক্ররা নিশ্চয়ই হত্যা করেছে তার নাতিকে। ছেলেটিকে দেখে ভিষণ অবাক হলো দাদীমা। জীবন্ত ছেলেটা অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছে।
দাদীমা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “পশ্চিমে তুমি আর কখনো যাবে না। কখনো যাবে না কথা দাও আমাকে।”
“আর কখনো যাব না। শুধু একবার যেতে হবে, আমাকে। আগামীকাল। এখন পর্যন্ত শক্রটা মরেনি। কিন্তু আমি তাকে মারবই। কালকেই সব জানতে পারবে তুমি।”
পরদিন সকালে। দাদীমা দুই হাত তুলে দরজা আগলে দাঁড়ালেন। আজ তিনি ছেলেটাকে বাইরে যেতে দেবেন না। ছেলেটি দাদীমাকে টেনে কোলে নিল। তারপর আশ্বস্ত করল, সে শক্রটাকে পুরোপুরি মেরেই ফিরে আসবে।
যখন সে দিঘির ধারে গেল, সূর্য তখন মধ্য গগনে। দিঘি শুকিয়ে খটখটে। কোথাও পানি নেই। মাটি ফাটা। যেন বিশাল একটা মাটির গর্ত। সেই পাথরের চাঁইয়ের ওপর বিশাল বড় একটা ব্যাঙ বসে আছে। আর কিছুই নেই দিঘিতে। ব্যাঙটা মিহিস্বরে বলল, “তুমি তোমার জাদু-পাথরটা আজ নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছ, আমি বসে আছি সেই জাদু পাথরের ওপর। যদি আরও যদি সাহস থাকে আসো আমার কাছে।”
কিন্তু ছেলেটা তখন ধনুকে তীর ঠিক করে নিল। লক্ষ্যস্থির করল ব্যাঙটার দিকে। তীরটা ছুটে গেল তীব্র গতিতে। ব্যাঙটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। পাথরের চাঁইয়ের ওপর মরে পড়ে রইল বিশাল আকৃতির ব্যাঙটা।
তারপর ছেলেটা হাঁটতে হাঁটতে গেল সেই পাথরের চাঁইটার কাছে। সেই বিশাল পাথরখণ্ডে হাতের ছোঁয়া রাখতেই সেটা আস্তে আস্তে নুড়িতে পরিণত হল। ছেলেটা যত্ন করে তার জাদু নুড়িটা আবার রেখে দিল তার কোমরের ছোট্ট চামড়ার থলেতে।
তারপর ফিরে এল বাড়িতে।
দাদীমাকে বলল সে, “দাদীমা, আমি হত্যা করেছি তোমাদের শক্রকে। সেই শক্র আর কোনদিন তোমাদের জ্বালাতন করবে না। আজ আমরা স্বাধীন। যখন ইচ্ছে হবে যাব আমরা পশ্চিমে বা পুবে।”
দাদীমা সমস্ত ঘটনার মূলে আছে আমার সেই প্রিয় বন্ধু প্যাঁচার কল্যাণে।
তারপর ছেলেটি দাদীমাকে সবিস্তারে সব বলল। দাদীমা শুধু মৃদু হেসে বললেন, “চিন্তা করো না, তোমার বন্ধু খুব শিগ্রি ফিরে আসবে।”
সত্যি সত্যি একদিন। টুই .... টুই ই ... টুইই .... শব্দে ফিরে এল প্যাঁচাটি। বাড়ির ছাদে বসে মিষ্টি সুরে সে ছেলেটিকে ডাকতে লাগল। ছেলেটা কাছে আসতেই আনন্দে ফরফর করে উঠল প্যাঁচা।
“আমার ছোট্ট বন্ধুটা .... এখন দেখি অনেক বড় হয়ে গেছে।”
“এসো কাছে এসো ....। কি বলে যে ধন্যবাদ তোমার...”
“ধন্যবাদের প্রয়োজন নেই। বন্ধুর জন্য বন্ধুর এটা কর্তব্য।”
তারপর প্যাঁচা বলল, “আমি ফিরে যাচ্ছি আমার বাসস্থানে। সেই গাছের কোটরে। তোমার আমন্ত্রণ রইল। যখন খুশি এসো তুমি।”
ডানা নাচিয়ে প্যাঁচাটা উড়াল দিল। টুই ... টুই ই ... টুই ই ...।