Category: গল্প
News Headings
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
খরগোশের টাকা চাষ
অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়
একা কবরস্থানে
তৈল মর্দন
দুই ভূতের কান্ড
বাঘ-সিংহের গল্প
মরগানস উডসের ভূত
মহাকাশে সু ভূতের অভিযান
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
আষাঢ়ে হাতি ও রাজার গল্প
ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু
ড্রাগনের যম ইভান
হানাবাড়ির উন্মাদ
চাঁদের বন্ধু খরগোশ
ঘুপুর বন্ধু টুনু আর চি
চাষা ও তার গরু
কান্নার দাগ
ছোট্ট জাদু-নুড়ি
লুকোচুরি
জামাটা কোথায় গেল
শিয়াল রাজার সাজা
Jan 11, 2009
Source: bdnews24.com
Source: bdnews24.com
কুয়োর ব্যাঙের সমুদ্র যাত্রা
বিজয় মজুমদার
অচিনপুর গ্রামটা বেশ বড়। কিন্তু তারচেয়ে বড় গ্রামের শেষে মাঠটি। আবার মাঠের চেয়েও বড় মাঠের পাশের বন। মাঠের শেষে বনের ধারে একটা বড় কুয়ো আছে। গ্রামের লোকেরা বনে যায়। পথে সেই কুয়োর পানি পান করে। তা না হলে কুয়োটি পড়ে থাকে সারা বছর। কেন এই মাঠের পারে নির্জনে এই কুয়ো? গ্রামের বুড়োরা বলাবলি করে, সে অনেক দিন আগে এক রাজপুত্র শিকার করতে এসে পথ হারিয়ে ফেলে। শেষে মাঠের ধারে এসে পানি না পেয়ে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাজা এরপর মাঠের পাশে এই কুয়োটি খনন করে দেন, যাতে কেউ বনের ধারে এসে পানির পিপাসায় কষ্ট না পায়। তবে কালেভদ্রে লোকেরা এখানে আসে।
দেখতে দেখতে কুয়োটাও বেশ ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু কুয়োর ভেতরটা অনেক গভীর। অনেক নীচে এর জল। সেই জলে শ্যাওলা, ফার্ণ ইত্যাদি জন্মে জঙ্গল হয়েছে। জলের পোকা, মাছ আর কিছু ব্যাঙ এসে বাসা বেঁধেছে সেই জঙ্গলে। কুয়োর তলে তারা আরামেই বাস করে। কুয়োতে জলও বেশ। যখন চারপাশ গরমে শুকিয়ে যায়, তখনও কুয়োর জল শুকায় না। দু-একটা ব্যাঙ মাছের ছানাদের ধরে খায়। মাছেরাও দু-একট ব্যাঙাচিকে টুপ করে মুখে পুরে নেয়। এই টুকু গোলমাল ছাড়া কুয়োটা একেবারে শান্ত। মাছ আর ব্যাঙ মিলে কুয়োর জঙ্গলে আরামে দিন কাটায়।
রাতের বেলা বুড়ো ব্যাঙ দাদু নেমে আসে জলে। ব্যাঙাচিদের গল্প বলে। কবে কোন ব্যাঙ কুমার এক রাজকন্যাকে খুঁজতে গিয়ে খুঁজে পেল এই কুয়ো। ব্যাঙাচিদের দল মনে মনে ভাবে সেই হবে সেই রাজকুমার। কিন্তু দু-একজন কুয়োর দেয়াল বেয়ে উঠতে গিয়ে দেখে যে ভারী পিছল সে দেয়াল। রাতে তারা গল্প শুনে আর সকালে শ্যাওলার বনে পণ্ডিত ব্যাঙের পাঠশালায় যায়। পুরনো পুঁথি খুলে শিক্ষক বলেন, “এই যে দেখছ এটা আমাদের পৃথিবী।”
“কিন্তু বুড়ো দাদু যে বলে, ব্যাঙ রাজপুত্র অন্য কোথা থেকে এসেছে!”, কৌতুহলি নামে এক ব্যাঙ প্রশ্ন করে।
“বুড়োটা রাজ্যের আজগুবি গল্প জানে। ওর কথার না আছে মানে না আছে মুণ্ডু।”, শিক্ষক বলে।
এতে দমে যায় না কৌতুহলি। ওকে সবাই কৌতুহলী বলে ডাকে। কারন সব সময়ই সে প্রশ্ন করে। তার প্রশ্নের জবাব জানে না অনেকেই। তাই তারা বিরক্ত হয়। বলে, “দুর বাপু ! এই সব প্রশ্নের উত্তর জেনে আমাদের কি লাভ? আমাদের এটাই পৃথিবী। এখানে আমরা আরামেই আছি। এর বাইরে যাওয়ার কি দরকার। এত প্রশ্নের উত্তর জেনেই বা লাভ কি?
বুড়ো দাদুকে সে প্রশ্ন করে, “এটাই কি পৃথিবী?”
বুড়ো দাদু বলে, “না না, এই কুয়োর বাইরে আছে মাঠ। তার পরে আছে গ্রাম।”
কৌতুহলী বলে, “তুমি কি ভাবে জানলে?”
বুড়ো দাদু বলে, “যখন আমার বয়স কম একবার কুয়োটা পার হবার চেষ্টা করেছি। মাঠ আর গ্রামটা চোখে পড়ে বটে। কিন্তু গ্রামের মানুষদের মারামারি দেখে আমি পালিয়ে কুয়োর ভিতর আবার চলে আসি।”
কৌতুহলি আরো জানতে চায়। কিন্তু সে তাকিয়ে দেখে বুড়ো দাদু ঘুমিয়ে পড়েছে।
পাঠশালায় সে গিয়ে শিক্ষককে বলে, “আমাদের এই কুয়োর বাইরে কি আর কোন কিছু নেই।”
শিক্ষক বলে, “থাকতে পারে, কিন্তু আমার তা জেনে কাজ কি? তোমারই তা জেনে কাজ কি? তারচেয়ে শেখ কীভাবে ব্যাঙাচি থাকতে লেজ নাড়াতে হয়। লেজ খসে গেলে কিভাবে দুই পায়ে সাঁতার কাটতে হয়।”
“কিন্তু এর বাইরে যারা আছে?”, কৌতুহলীর কৌতুহল ভরা প্রশ্ন।
শিক্ষক জবাব দেয়, “দেখ অন্য পৃথিবী থাকুক অন্য জায়গায়, কুয়োর ব্যাঙদের এত কৌতুহল ভাল নয়। আর আমাদের এই কুয়োটাই আমাদের পৃথিবী। এটা কত সুন্দর দেখেছো।”
কৌতুহলী ভাবতে ভাবতে একদিন বুড়ো হয়ে যায়। আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে সে ভাবে চাঁদেও কি ব্যাঙ বাস করে?
বুড়ো হয়ে সেও ব্যাঙাচিদের পাঠশালার শিক্ষক হয় একদিন। ব্যাঙাচিরা লেজ দুলিয়ে তার কাছে পড়তে আসে। কৌতুহলি বলে, “এই যে দেখছ এটা আমাদের দেশ। আমাদের ঘর।”
একজন তাকে প্রশ্ন করে, “এটাই কি আমাদের পৃথিবী?”
কৌতুহলী বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, এটাই আমাদের পৃথিবী।”
যে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় সেই হল এখনাকার পালের গোদা। তাকে সবাই অভিযাত্রিক বলে ডাকে। সাহস খুব বেশি। সে মাঝে মাঝে চলে যায় ঘন শ্যাওলার জঙ্গলে।
সে আবার প্রশ্ন করে তার শিক্ষককে, “আচ্ছা আমি যদি এই কুয়োর উপরে উঠি তাহলে কি দেখতে পাব?”
“একটা মাঠ।”, তার শিক্ষকের জবাব।
“তারপরে?”, অভিযাত্রিকের প্রশ্ন।
“তারপরে একটা গ্রাম।”, শিক্ষকের জবাব।
“আর গ্রামের উল্টোদিকে, সেখানে আছে ঘন জঙ্গল। তারপরে কি আছে ব্যাঙরা কেউ জানে না।”
কৌতুহলী তার ছাত্রের কথায় তাকে জানায়, “একদিন সেও এই মাঠ পড়ি দিতে চেয়েছে। কিন্তু পথে অনেক বিপদ তাই সে আবার কুয়োতেই ফিরে এসেছে।”
ব্যাঙাচিরা কুয়োর তলায় ব্যাঙ লাফ খেলে। অভিযাত্রিক বলে সে একদিন এই কুয়োর উপর উঠব। পৃথিবীকে দেখবে। বন্ধুরা বলে, সর্বনাশ। এখনও তো লেজ খসেনি। বাবা মা বলে, “এ রকম পাগলামি করবি তো মরবি।”
অভিযাত্রিক অপেক্ষায় থাকে তার লেজ খসার। নইলে সে পৃথিবী দেখতে পারবে না। বুড়োরা কুয়োর ফাটলে বসে গল্প করে আর বলে, “কুয়োটা কত বড় আর সুন্দর!”
আর এদিকে কুয়োর শান্ত জলে ছোটরা খেলে বেড়ায়।
তবে অভিযাত্রিক চায় এই কুয়োতে একটা কিছু ঘটুক। একদিন জলে তোলপাড় উঠল। জলের ঢেউয়ে সবাই দুরে সরে যায়। বুড়োরা লুকায় ফাটলে, আর ব্যাঙাচিরা শ্যাওলার জঙ্গলে। ঢেউ শান্ত হয়ে এলো। জলে একটা প্রাণী ভেসে আছে। গা দিয়ে রক্ত পড়ছে। তার মাথাটার চেয়ে শরীরটা বড়, আর পীঠের মধ্যে একটা বড় ঢাকনা। যদিও প্রাণীটা তেমন নড়ে না চড়ে না। বুড়োরা কিন্তু সবাইকে বললো, “সাবধান!”
দু-একজন তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে। “ও কিন্তু তোমাদের খেয়ে ফেলবে”, বুড়োদের হুঙ্কারে আবার পিছিয়ে যায় সাহসীরা।
জীবটা শ্যাওলা ছাড়া আর কিছুই খায়নি। সাহস নিয়ে তার কাছে এগিয়ে গেল অভিযাত্রিক। গুটি গুটি লেজে সাঁতার কেটে সে প্রাণীটাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কে?”
“আমার নাম কচ্ছপ। আমি দূর সমুদ্রে যেতে চাইছিলাম। কিন্তু চিল আমাকে উঁচিয়ে শূন্যে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখান থেকে পালাই। আবার ঈগল ধরে খেতে চায় আমায়। পালাতে গিয়ে এই এই জলের ভেতর পড়েছি। আমি এখন আহত এবং ক্লান্ত।”
অভিযাত্রিকের দেখাদেখি অন্য ব্যাঙাচিরা এসে ভিড় জমায়। তারা আসে কচ্ছপের সঙ্গে গল্প করতে। কচ্ছপও যে কত রকমের গল্প জানে! সে বলে, “আমি হলাম কচ্ছপ। আমাদের বাস গভীর সমুদ্রে।”
“সমুদ্র কি কুয়োর চেয়ে বড়?”, একজন ব্যাঙাচি জানতে চায়।
“সমুদ্র কুয়োর চেয়ে অনেক বড়। সেখানে এত জল যে গুনে শেষ করা যাবে না। সেখানে আছে ছোট্ট তারা মাছ। আছে বিশাল নীলতিমি। কত হাজার হাজার রকমের প্রাণী যে সেখানে, বলে শেষ করা যাবে না।”
“তুমি কি সমুদ্র দেখছ?”, ব্যাঙাচিদের একজন জানতে চায়।
“না না এখন আমি সমুদ্র দেখিনি? কিন্তু আমার বাবা মা যখন ডিম পাড়ে তখন ডিমের কানে কানে যে কথা বলে, তাতেই আমরা সমুদ্র সমন্ধে ধারণা পেয়ে যাই।”
“তোমাদের বাবা মা তোমাদের সঙ্গে থাকে না?”, আরেক ব্যাঙাচি জানতে চায়।
“আমাদের বাবা মা ডিম পাড়ার সময় হলে সমুদ্রে থেকে ডাঙ্গায় আসে। তারপরে সেখানে ডিম পেড়ে চলে যায়। বালুতটে ডিম ফুটে আমরা বাচ্চা কচ্ছপ বের হই। সেই বালুতটে থেকে রওনা দেই সমুদ্রের দিকে। সমুদ্রে যাওয়ার আগে আমাদের নানা বিপদ পাড়ি দিতে হয়। অনেক প্রাণী আসে আমাদের খাবার জন্য। কত বিপদ? সব তুচ্ছ করে আমরা যেতে থাকি। পথে মারা পড়ে অনেকে। শেষ পর্যন্ত যারা টিকে থাকে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে সমুদ্রে।”
“তুমি এখানে কেন?”, একজনের প্রশ্ন।
“আমি সমুদ্রেই যাচ্ছিলাম। এক চিল আমাকে ছোঁ মেরে তুলে নেয়। সে যখন উড়ে তার বাসার দিকে যাচ্ছে তখন তার পিছে লাগে এক ঈগল। সে চিলকে তাড়া করে। তার থাবা থেকে পড়ে আমি যখন পালাতে যাই। আর তখন আমাকে তুলে নেয় ঈগল পাখি। সেই ঈগলকে আবার তাড়া করে আরেকটা বড় ঈগল তখন সে আমাকে এই কুয়োর মধ্যে ফেলে দেয়।”
“সমুদ্রে যাওয়ার জন্য এত ঝক্কি?”, ব্যাঙাচিরা বলে।
“হ্যাঁ, সমুদ্র অনেক বড়। সেখানে যত বিপদই হোক আমাদের যেতেই হবে।”, বলে কচ্ছপ তার গল্প শেষ করে।
বুড়োরা ব্যাঙাচিদের যতই মানা করুক, ব্যাঙাচিরা ঠিকই কচ্ছপের গল্প শুনতে যায়।
তারপরে স্কুলে এসে প্রশ্ন করে, “ও মাষ্টার মশাই আমাদের বাবা মা কি মাটিতে ডিম পাড়ে?”
কৌতুহলি উত্তর দেয়, “না আমরা ব্যাঙেরা দুইভাবে জীবন যাপন করি।”
“সে কিরকম ?”
“ব্যাঙেরা পানি বা পানির বাইরে দুই জায়গায় জীবন কাটাতে পারে। ডিম পাড়ার সময় ব্যাঙ পানিতে গিয়ে ডিম পাড়ে। সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় ? সেই বাচ্চারা হলে তোমরা ব্যাঙাচিরা। যখন তোমাদের লেজ খসে পড়বে, তখন তোমরা ব্যাঙ হবে। তোমরা তখন মাটিতে চলাফেরা করতে পারবে?”
“কে তোমাদের ডিমের কথা বলেছে?”, কৌতুহলি জানতে চায়?
“কচ্ছপ!”, একসাথে সব ব্যাঙাচি উত্তর করে।
বুড়োরা শংকিত হয়ে ওঠে। কচ্ছপটা কি তাদের ছেলেদের মাথা চিবিয়ে খাবে?
“আজ তোমাদের শোনাবো কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড়ের গল্প...”, কচ্ছপ শুরু করে।
“খরগোশ কেমন?”, একজন ব্যাঙাচি বলে
“তোমরা কুয়োর ভেতর থেকে দেখি পৃথিবীর কিছুই দেখনি? খরগোশ হলে আমাদের মত চার পায়ের প্রাণী। তারা খুব জোরে দৌড়াতে পারে।”
“তারা কি সাঁতার কাটতে পারে?”, আরেকজন জানতে চায়।
“তারা সাঁতারে তেমন দক্ষ নয়। তবে তাদের কান খুব খাড়া। আচ্ছা যা বলছিলাম, যেহেতু খরগোশেরা খুব জোরে দৌড়ায় তাই তাদের খুব বড়াই। তারা একবার কচ্ছপকে বললো, তোমরা আমাদের সঙ্গে দৌড়ে কখনই পারবে না। আমাদের মধ্যে এক কচ্ছপ বললে, ঠিক আছে আমি তোমার সঙ্গে দৌড়ের প্রতিযোগিতা করবো। অনেকেই ভয় পেল । কিন্তু সাহসী কচ্ছপ বললো, হারিজিতি -দৌড়াতে রাজি।
দৌড় শুরু হবার সাথে সাথে খরগোশ কয়েক লাফে অনেক দুর চলে গেছে। পেছন ফিরে সে দেখে,কচ্ছপের কোন দেখাই নেই। সে ভাবলো, কচ্ছপটা আমাকে ধরতে যখন পারছে না। একটু ঘুমিয়ে নেই। খরগোশ ঘুম থেকে উঠে দেখে কোথাও কচ্ছপ নেই।
যা বাবা এত আস্তে চলে, যাকগে আমি আবার দৌড় শুরু করি, বলে খরগোশ আবার দৌড়াতে শুরু করে। যখন দৌড় শেষে করছে, সে দেখে, কচ্ছপ আনেক আগে এসে হাজির।
বুঝলে বন্ধুরা, সাহস কর। ধৈর্য্য ধর। জিত তোমারই। যেমন জিতেছিল আমাদের কচছপ।”
গল্পর আসর জমে উঠলো ছেলেদের। বুড়োরা ঠিক করলো কচ্ছপটাকে বের করে দেবে। কিন্তু কার গায়ে এত জোর। ছোটদের বলা হল, তারা যেন আর কচ্ছপের সঙ্গে না মেশে। তবু একজন ঠিকই মেশে।
তুমি খুব সাহসী ছেলে অভিযাত্রিক, “কচ্ছপটা বলে?”
“হ্যাঁ আমি সমুদ্র দেখতে চাই।”
“তুমি সাহসী। কিন্তু মনে রেখ সমুদ্র এখান থেকে অনেক দুরে। যাবার পথে, পদে পদে বিপদ। তুমি কুয়ো থেকে কখনই বের হওনি। তোমার জন্য ও পথ আরো ভয়ংকর। সবচেয়ে বড় কথা তুমি তো সমুদ্রে বাস করতে পারবে না। সেখানকার জলে লবন ভরা। সেই জলে তুমি নিঃশ্বাস নিতে পারবে না।”
“তবুও আমি দেখতে চাই সমুদ্র কত বড়?”
“সমুদ্র অনেক বড়। পৃথিবীতে তিনভাগ জল আর একভাগ মাটি। সেই জল আছে সমুদ্রে আর মহাসমুদ্রে।”
“আমি তোমার সঙ্গে যাব?”, অভিযাত্রিক বলে।
“তুমি সমুদ্রে বাস করতে পারবে না। দূর থেকে দেখতে পারবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা এখন তেমার লেজ খসেনি লেজ না খসলে তুমি ডাঙ্গাতে উঠতে পরবে না ? আর তোমাকে অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে সমুদ্রে যেতে হবে? আমি এখানে আর বেশিদিন থাকতে পারবো না।”
“আমি যেভাবেই হোক একদিন সমুদ্র দেখবো।”
“তোমার দৃঢ় ইচ্ছা আছে। একদিন তুমি অবশ্যই সমুদ্র দেখবে। দেখ কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে। আমরা শরীরও ঠিক হয়ে উঠছে। কালকে আমি চেষ্টা করেছি এই কুয়োর দেয়াল বেয়ে উঠতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। আজ আবার চেষ্টা করবো। বিদায় বন্ধু। শুভরাত্রি।”
পরের দিন সকালে কচ্ছপটাকে আর দেখা গেল না। অভিযাত্রিক মন খারাপ করলো বটে আবার খুশিও হল। কচ্ছপ রওনা দিয়েছে সমুদ্রের পানে।
বুড়োরা বললো, “ভালই হয়েছে। আপদ বিদায় হয়েছে।”
দুই পূর্ণিমা পার হয়েছে। অভিযাত্রিক দেখলে তার লেজ মিলিযে গেছে। সে ব্যাঙাচি থেকে হয়ে গেছে ব্যাঙ। খুশিতে আত্মহারা সে। আমি এখন জলের বাড়ী ছেড়ে ডাঙ্গায় উঠতে পারবো।
“খবরদার। সাবধান জলের বাড়ী ছেড়ে ডাঙ্গায় বেশিক্ষণ থাকলেই বিপদ।”, কে বলছে দেখতে গিয়ে দেখে, বুড়ো ব্যাঙ দাদু।
আকাশ ভরা পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে পড়েছে কুয়োতে। সেই আলোয় ভেসে গেছে সব। পানির নীচে বসে মাথার উপর তাকিয়ে দেখে। পুরো চাঁদ হাসছে। কুয়োর তলায় জলের মাঝে শ্যাওলার বনে ঘুমিয়ে আছে মাছেরা। কুয়োর কোটর থেকে ভেসে আসছে ব্যাঙদের নাক ডাকার শব্দ। আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। কেমন শান্ত চারিধার। কুয়োর তলায় বালুরেখায় আলো চিকচিক করছে। পুরনো ব্যাঙের ছাতায় ঘুমাচ্ছে ব্যাঙ দাদু।
আর দেরি নয়, রওনা দিতে হবে। কুয়োর ফাটলে একটা পা রেখে উপরে ওঠার চেষ্টা করলো অভিযাত্রিক। জলে মৃদু আলোড়ন। পা পিছলে পড়ে গেছে অভিযাত্রিক। কেউ জেগে গেল নাতো? আবার চেষ্টা করা যাক।
“ও পথ দিয়ে তুমি কুয়োর উপরে উঠতে পারেবে না।”, অভিযাত্রিক চমকে উঠলো। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে, তার শিক্ষক কৌতুহলী।
“ও পথটা খুবই পিচ্ছিল। ও পথে উপরে ওঠা সহজ নয়। অনেক আগে আমি ও পথ দিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করেছি। পরে খুঁজতে গিয়ে আমি আরেকটা রাস্তা বের করেছি। ওই ফাটলের পথ দিয়ে অনেক গাছপালা গজিয়েছে। ওটা ধরে তুমি উপরে উঠে যেতে পার।”
কৌতুহলীর উঠছে পেছনে অভিযাত্রিক। কৌতুহলীর বয়স বেড়ে গেছে। সে খানিকটা বিশ্রাম নেয়। আবার এগিয়ে যায়। কুয়োর উপরে উঠে তারা নিচের দিকে তাকালো।
কৌতুহলী বলতে থাকে, “নীচ থেকে কুয়োটাকে কেমন যেন অন্য রকম লাগে, তাই না। আমারও শখ ছিল একদিন পৃথিবী দেখবো। খুঁজে খুঁজে এই পথ বেয়ে এই পর্যন্ত এসেছিলাম। এখান থেকে নীচে তাকিয়ে দেখি আমাদের কুয়োটা কত সুন্দর। পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়তে আর মন করলো না। তোমার সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছে। তুমি যেতে চাও। আজ তোমার সাথে আমরাও যাবার ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু আমি বুড়ো হয়ে গেছি। পথে হাঁপিয়ে পড়বো। আমাকে নিয়ে বিপদে পড়ে যাবে। পথে যে অনেক বিপদ। সাপ, পাখি, এরা আমাদের শত্রু। সাথে আরেকটা শত্রুর কথা মনে রেখ। দু পায়ের মানুষ। তারাও তোমার ক্ষতি করতে পারে। যদি ফিরে আসো, আমাকে শোনাবে সমুদ্রের গল্প। যাও আর দেরি নয়, বেড়িয়ে পড়।”
এক লাফে কুয়া থেকে নেমে পড়লো মাটিতে অভিযাত্রিক। পড়লো ঘাসের উপর। কুয়োর পাশের ঝিঁ ঝিঁ পোকা বলে উঠলো, “এই কে রে আমার ঘুম ভাঙ্গালো।” কিন্তু আশে পাশে কাউকেই দেখতে পেল না অভিযাত্রিক।
তবে যেখান থেকে আওয়াজ এলো সেখানে গিয়ে সে বললো, “আমি দু:খিত।”
“সাবধান! জোরে চেঁচিও না। আশেপাশে অনেক বকের বাসা। তোমার কথা শুনতে পেলে তোমাকে খেয়ে ফেলবে।”, ঘাসের ভেতর থেকে একটা ব্যাঙ মাথা বের করে বললো। “ও তোমার সঙ্গে পরিচয় হয় নি। আমার নাম কুনো। দেখতেই পাচ্ছ আমি তোমার স্বজাতি। রাতের বেলায় গলা ছেড়ে গান গাইতে নেই। তবে বৃষ্টি এলে এমনিতেই গলা খুলে যায়। গলা খুলতে ভয় পাই। এই সেদিন আরেকটু হলেই গেছিলাম আর কি? পাতার কাঁপন দেখে ভাবলাম ওখানে কি ? দেখি একটা সাপ আপন মনে হিস হিস করছে। মুখে কোন কথা নেই। নিঃশ্বাস যেন না শুনতে পায়। জোরে কথা বললেই যাবে সাপ নয় তো পাখির পেটে।”
“আমি অভিযাত্রিক।”, নিজের পরিচয় জানায় কুনোকে। “আমি থাকি ওই কুয়োর ভেতর। কিছুদিন আগেও আমি ব্যাঙাচি ছিলাম।”
“ও তাহলে তুমি আমার চেয়ে ছোট। আমি ওই যে পাশের জঙ্গলে জন্মেছি। ওখান থেকে এখান এদিকে এসেছি। যদি কোন পোকামাকড় পাই। ওখানে একটা সাপ ঘোরাঘুরি করছে। তোমাকে দেখলাম তুমি ওই কুয়োর উপর থেকে লাফ মারলে। তা কোথায় যেতে চাও?”, কুনোটা বললো।
“আমি সমুদ্র যাত্রায় বেড়িয়েছি।”, অভিযাত্রিক বললো।
“তুমি জানো সমুদ্র কোন দিকে?”, কুনোর জিজ্ঞসা ?
মাথা নাড়লো অভিযাত্রিক।
কুনো বললো, “আমার ধারণা সমুদ্র পূর্ব দিকে হতে পারে। যদি পুর্ব দিকে না হয় তবে অবশ্যই তা পশ্চিমে। আর পশ্চিমে যদি না হয় তাহলে তা অবশ্যই উত্তরে। যদি দেখ যে উত্তর দিকে সমুদ্র নেই তাহলে তা অবশ্য দক্ষিণ দিকে পাবে। যে দিকেই যাও সমুদ্র।”
“সমুদ্র তাহলে চারদিকে?”, অভিযাত্রিক জিজ্ঞেস করে।
“অবশ্যই চারদিকেই সমুদ্র। তবে আমার মনে হয় জঙ্গলের ধারে নদী। তার পাড় দিয়ে গেলে সমুদ্র পাওয়া যাবে। যেতে যেতে একসময় মাটি শেষ। সেটাই সমুদ্রের পাড়। সমুদ্র বিশাল। সমুদ্রের চেয়ে বড় হলো মহাসমুদ্র। আচ্ছা তুমি সমুদ্রে যেতে চাও কেন?”
“আমি দেখতে চাই সমুদ্র, আকাশ, পৃথিবী। এটা আমার কৌতুহল। সমুদ্রের নীল জল কেমন?”
“শুধু কৌতুহল। বটে জীবন বাজী রাখছো। দেখ তোমাদের কুয়োর জগত সমন্ধে জানিনা। আমি তো ভাবি সেখানে অনেক আরাম। আমারই তো মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চারপাশ দেখা বাদ দিয়ে কুয়োর মধ্যে ঝাপ দিয়ে ওর জলেই কাটাই। যাকগে, যা এক পূর্ণিমায় হয় না তা কোন পূর্ণিমায় নয়। তুমি যদি জঙ্গলের ধার দিয়ে নদীর পার দিয়ে যাও। আমি তোমার সঙ্গে নদীর ধার পর্যন্ত যেতে পারি। নদীর ধারে আমার মামাতো ভাইয়ের চাচাতো ভাই এর বাস। তাকে অবশ্য আর দেখা যাবে না। সাপে খেয়ে ফেলেছে তো তাই। তার ছেলেমেয়েদের অন্তত একটু সান্তনা দিতে পারি।”
অভিযাত্রিক আর কুনো রওনা দিল। আকাশে চাঁদ ঠিক মাথার উপর।
“যে পথ দিয়ে যাব, সেখানে আছে নানা বিপদ। চোখ কান খোলা রেখে চলতে হবে।”, বলতে বলতেই কুনো ব্যাঙ ঝপাত করে পড়ে গেল একটা পচা ডোবায়।
“এহ আরেকটু হলেই শিং মাছটা গুতিয়ে দিত।”, ডোবার পচা পানি মুখ থেকে বের করে কুনো ব্যাঙ বলল। “যা বলছিলাম সাবধানে চলবে?”
ডোবাতে অনেক ব্যাঙ দেখা গেল। তারা জানালো কয়েকদিন বৃষ্টি হয়নি। তারা গলায় জোর পাচ্ছে না। বৃষ্টি না হওয়াতে আমারও চোখের জোর কমে গেছে। মনে রেখ রাতের বেলায় চলাটাও সহজ নয় মোটেও।
চাঁদের আলোয় বনটা যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠছে। গাছপালা সব ঘুমিয়ে আছে। জেগে আছে ঝিঁ ঝিঁ পোকা। সব সময় অভিযাত্রিক দেখেছে মাথার উপর চাঁদ। তারপর সে হারিয়ে যায়। আজ দেখতে পাচ্ছে চাঁদও তাদের সঙ্গে যাচ্ছে।
“মুগ্ধ নয়নে তাকিও না, চাঁদের দিকে তাকানোর কি আছে। ওটা একটা মাকাল উপগ্রহ। ব্যাঙদের বসবাসের অযোগ্য। আমার জ্যোতিষ চাচা তো চাঁদ দেখলে ভারী বিরক্ত। চাঁদের কারনে তারাদের ঠিকমতো দেখা যায় না।”
“তবুও চাঁদ সুন্দর।”, অভিযাত্রিক বললো।
“দিনের বেলায় চাদকে দেখা যাবে না। তখন আমরা কোন গর্তে লুকাবো। পাতার অড়ালে লুকোতে পারি।”
কুনো ব্যাঙ বলেই চলছে, “দিনের বেলা। আমার মামাতো ভাইয়ের চাচাতো ভাই পোকা ধরার জন্য বের হয়েছে। অমনি সাপে খেয়ে ফেলেলো। দেখ দেখি সাপদের কেমন ব্যবহার। আমাদের ধরে ধরে খেয়ে জীবন ধারণ করতে হবে? আমরা অবশ্য পোকা খাই। কিন্তু ভেবে দেখ অমরা যদি পোকাদের না খেতাম তবে পোকার বংশে পৃথিবী ভরে যেত? ঠিক কিনা বল?”
“দেখ শুনে , সাপের গর্তে ব্যাঙের পা যেন না পড়ে, তুমি নিশ্চয়ই এই প্রবাদটা শুনেছো।”, কুনো জবাবে মাথা নাড়লো অভিযাত্রিক। “মানে ভূল জায়গায় পা না দেওয়া। এই যে যেমন মানুষেরা বলে কুপমুন্ডক। তার মানে জানো তো। তার মানে হল কুয়োর ব্যাঙ, যে কিছু জানে না, মানুষ নিজেই অনেক সময় নিজের ঘর ছেড়ে বের হতে চায় না। আমার খালাতো ভাইয়ের ফুপাতো ভাই মানুষদের পাঠশালার স্কুলের পেছনে বাস করে তার কাছ থেকেই এ সব শুনেছি।”
হঠাৎ কুনো “লুকাও লুকাও” বলে দুই লাফে সামনের ঘাসের ঝোপে আড়াল হল।
অভিযাত্রিক কিছু না বুঝেই দৌড় দিলো।
আড়ালে এসেই কুনো হাফাতে হাফাতে বললো, “শুনতে পাচ্ছ?”
অভিযাত্রিক কান পেতে শোনার চেষ্টা করলো। একটা শব্দ শুনতে পেয়ে বললো, “ওটা কিসের শব্দ?”
“ওটা হল ডানার শব্দ। চামচিকেরা বের হযেছে খাবারের সন্ধানে।”
“বাঁচাও বাঁচাও”, বলে একটা শব্দ শুনতে পেল তারা, তারপর সব ঠান্ডা। অভিযাত্রিক ছুটে বের হতে যাচ্চিল কিন্তু তাকে আটকে দিল কুনো ব্যাঙ। তুমি ওই হতভাগা ব্যাঙটাকে তো বাঁচাতে পারতে না, তার বদলে তারই খাদ্যে পরিণত হতে।
“অনেক হয়েছে চল, এবার ওই ঝোপোর আড়ে ঘুমিয়ে থাকি। তারা দুজনেই অবশ্য ঘুমানের আগে কয়েকটা ঘাস ফড়িং খেয়ে ফেললো?”
রাত ভোর হয়ে আসছে, কুনোটা হাই তুলছে। হঠাৎ চোখ এক ঝলক আলো এসেছে। এতদিন কুয়োর ভেতরে থেকে যে আলো দেখেছে এটা সে রকম আলো নয় ? ওটাই সূর্য অভিযাত্রিক অবাক হয়ে তাকায়।
“ওভাবে তাকালে চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।”, কুনোটা ঘুমিয়ে পড়ার আগে তাকে সাবধান করে দিল।
অনেক হয়েছে কুনোর ডাকে ঘুম ভাঙে অভিযাত্রিকের। বেলা পড়ে আসছে। “চলো রওনা দিই ?”
“তার আগে আমরা চল ওখান থেকে কিছু পোকা ধরে খাই। বেশি আবার খেয়ে ফেল না তাহলে রাস্তায় চলতে পারবে না।” ঘাসের জঙ্গল ছেড়ে এবার তারা ঢুকে পড়লো গাছপালার জঙ্গলে। ছোট ছোট গাছের শেকড় বাঁধা হয়ে দাড়াচ্ছে। “এই যে রাস্তাটা দেখছ এটা দিয়ে সমুদ্রের ধারে যাওয়া যায়।”
কুনো ব্যাঙের কথায় অভিযাত্রিক বললো, “তাহলে আমরা সেই রাস্তা ধরে চল যাই।”
খবরদার সেই রাস্তায় যাওয়া যাবে না। তার চেয়ে আমরা গাছের ফাঁক দিয়ে রাস্তা বের করে যাব। তারা লাফাতে লাফাতে একা উঁচু ঢিপির উপর উঠলো।
“আহ হা আপনাদের দেখে আমার কি ভালো লাগছে? আসুন আপনাদের স্বাগত জানাই।”, ঠিক তার সামনের ঢোঁড়া সাপ। সাপের আহবান যেন অভিযাত্রিক এড়োতে পারছে না, কেমন যেন এক অদ্ভুত টানে তার মুখে চলে যাচ্ছে সে।
“তাহলে সমুদ্র দেখার এখানেই ইতি!”, বলে তাকে একটা ল্যাঙ মেরে কুনোটা লাফ দিল। দুজনেই গড়িয়ে পড়লো একেবারেই সেই ঢিপির গোড়ায়। আবার উল্টো দিকে দৌড়। দ্রুত এগিয়ে আসছে ঢোরা সাপ। তাদের কাছে এসে পড়েছে প্রায়। এমন শেষ বারের মত পৃথিবীকে দেখে নিতে হবে হায় পৃথিবী বিদায় ? বলে অভিযাত্রিক চোখ মুদল, সে শুনতে পাচ্ছে বাঁচাও বাঁচাও, একি এতো কুনো ব্যাঙের কন্ঠস্বর নয়। সে চোখ মেলে দেখে ঢোরা সাপটাকে গিলে খাচ্ছে একটা গুই সাপ।
“আহা চোখের সমানে খেয়ে ফেললো! অবশ্য এটাই প্রকৃতির নিয়ম। একজন আরেকজনের খাদ্য।”
কে বলছে কথাটা? এটা বের করার চেষ্টা করতে দেখে গাছের উপর পাতার একটা লাল পিঁপড়া আওয়াজ দিচ্ছে।
“আহা গাছ থেকে কথা বলছ একটু নীচে নেমে আস তোমার সঙ্গে আলাপ করি?”
কুনোর আওয়াজে পিঁপড়া বললো, “ও টি হচ্ছে না। আমি নিচে নামি আর তুমি তোমার জিহবা দিয়ে আমায় খেয়ে ফেল না! ওটি হচ্ছে না।”
“আমার দিকে ওভাবে চেয়ো না, তোমরা বাপু আমার দিকে পানে এভাবে তাকিয়ে দেখ না। কাউকেই বিশ্বাস নেই। অবশ্য এটাই নিয়ম জ্যান্ত অবস্থায় তোমরা আমাদের খাও আর মরার পর আমরাও তোমাদের খেয়ে শেষ করি।”, বলে সে গাছের মগডালের দিকে রওনা দিল।
“আহ কী লাফটাই না দিলে। ভাবছি অলিম্পিকে ব্যাঙ লাফ প্রতিযোগিতায় তোমাকে পাঠাবো। চল যেতে থাকি।”
হাঁটতে হাঁটতে লাফাতে লাফাতে তারা এল এক ঝর্নাও ধারে নালার পাশে।
“অনেক দৌড়া দৌড়ি হয়েছে। একটু জিরোই।”, বলে কুনো ব্যাঙ বসে পড়লো। তারপর শোনা যেত থাকলো তার নাক ডাকার শব্দ। অভিযাত্রিক বসে বসে ভাবতে লাগলো কুয়োর কথা, বন্ধুদের কথা, বাবা মার কথা, কৌতুহলীর কথা। ভাবতে ভাবতে কখন যে দু চোখ এক হয়ে এল টেরই পেল না। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ কুনোর জোরে জোরে ডাকে এবার ঘুম ভাঙ্গলো তার। আকাশে মেঘ জমে এসেছে। তাই জোরে জোরে ডাকছি। সামনেই বর্ষা নামবে, তাই ব্যাঙের ডাকটা একটু অনুশীলন করে নিচ্ছি। আহ বুঝলে কিনা বর্ষা এলেই আমাদের গলার আওয়াজ বেড়ে যায়।”, বলেই দুজন ডাক ছেড়ে ডাকতে থাকে। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ।
“কী বাছারা এত ফুর্তি কেন?”, নালার পাশে গর্ত থেকে মাথা বের করে এক কোলা ব্যাঙ মুখ বার করে কথা বলছে। “দিদিমা তুমি তো জানে না, বর্ষা এলে আকাশ থেকে পানি পড়ে।” অভিযাত্রিক উত্তর দিলো।
“কোথাকার ছোকরা রে তুই আমরা এখানেই সব সময়ই উপর থেকে পানি পড়ে। দশ চন্দ্রমাস কাটিয়ে দিলাম আর আমাকে জ্ঞান দিতে এসেছে।”, বলে আবার গর্তে মাথা ঢুকিয়ে নেয় কোলা ব্যাঙ।
“বুঝলে হে অনেকই আছে গর্তেও মধ্যে বাস করে ধরে নেয় পৃথিবীর সব কিছুই সে জানে।”
“এদের বলা উচিত কী বল তো?”, কুনোটা জানতে চায়।
“অবশ্যই গর্তমুন্ডক।”, অভিযাত্রিক এর কথায় উভয়ে হেসে ওঠে।
তারা নালা ধরে এগিয়ে যায়। রাত হয় অবাবার ভোর হয় আবার তারা বিশ্রাম নেয়। আকাশে মেঘের আনাগোনা বাড়ে। তারা আকাশের দিকে তাকায়। কুনো ব্যাঙ বলে, “বর্ষা পুরোপুরি নামার আগেই আমাদের পৌঁছাতে হবে। বর্ষা নামলে নদী তে বান ডাকবে। সেই বানে তুমি ভেসেও যেতে পার।”
“ও ঠিকই বলেছে।” নালার শেষে একটা পোনা মাছ ধারে এসে বলছে। “তা তোমরা নদীর পার ধরে কোথায় যেতে চাও।”
“ও যেতে চায় সাগর দেখতে আর আমি চলছি আমার মামাতো ভাইয়ের চাচতো ভাইয়ের ছানা পোনাদের দেখতে। তা সব ভালো তো।”
“আর ভালো কই ? এই মানুষেরা আশেপাশে এসেছে। জাল পেতে বড়শি দিয়ে তারা অনেক মাছ ধরে নিয়ে গেছে। তোমাদের সাবধান করি ওরা কিন্তু এখনও আশেপাশে আছে। বলে পোনা মাছ চলে গেল আরো নালার জলে।”
দুই ব্যাঙ আবার হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে তার এসে পৌঁছল নালার বাঁকে। এমন সময় অনেক মানুষের কন্ঠস্বর শোনা গেল। সবুজ পাতার আড়ালে লুকাবে। সাবধানে ওদের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। অভিযাত্রিক কিন্তু এখন মানুষ দেখেনি। তাই সে মাথা বাড়িয়ে দেখতে চাইলো।
“এই দেখ একটা ছোট্ট ব্যাঙ।”, বলে একজন তাকে দুহাতে নিয়ে নিল। এই বড় প্রানীগুলোই তাহলে মানুষ এরা দুপায়ে চলে। এরা তো দলবেঁধে চলছে।
একজন বললো, “না এত ছোট ব্যাঙ দিয়ে চলবে না।” বলে সে তাকে নালার ধারে ছেড়ে দিল।
সে ঝোপের ধারে এসে দেখে কুনো মাথা চাপড়ে হায় হায় করছে। “এখনও তুমি বেঁচে আছ। আমি তো ভাবলাম তোমাকেই ওরা বোয়াল মাছের চারা বানাবে? ভাগিস্য তুমি ছোট বলে বেঁচে গেছ। তবে এরপর থেকে সাবধান।”
আকাশের দিকে তাকিয়ে অভিযাত্রিক দেখে মেঘ জমে আসছে। তারা দুজনেই দেখে সামনে একটা ব্যাঙের ছাতা। তার নীচে এসে দুজনেই আশ্রয় নেয় বৃষ্টি কমলে তারা নালা দিয়ে পাড়ি দেবে। নালার ওপারে জঙ্গল। এখানে জঙ্গলটা পাতলা। ওই যে দেখা যায় বটগাছ। গাছের নীচে আসতেই ছানাপোনা সহ কুনোর চাচাতো ভাইয়ের মামাতো ভাইয়ের বউ তার ছেলে মেয়ে নাতি নাতনী বের হয়ে এলে।”
“শোন সামনের বাঁকে গিয়ে ডানে নালা। গেলে পাবে একটা নদী সেই নদীই গিয়ে মিশেছে নমুদ্রের ধারে। তবে নদীর মোহনায় গেলে তুমি কিন্তু আর সাঁতার কাটতে পারবে না। ওই নদীতেও কিন্তু বড় মাছ আছে। তবে তোমাকে জানিয়ে রাখি। তোমার শরীরে একটা বিষ থলি আছে। প্রয়োজন পড়লে ওটা ব্যবহার কর।”
“এখন থেকে বন্ধু তোমাকে একাই যেতে হবে।”, বিদায় বলে হাত নাড়ালো কুনো।
গাছটা পার হয়ে আরেকটু সামনে যেতেই চোখে পড়লো নালা। নালার সুন্দর চল ধরে সে চলল স্রোতে ভেসে ভেসে।
সামনে পড়লো কতগুলো চিংড়ি মাছ। তাদের সে শুধালো সমুদ্রের পথ।
“আহ ষাঁড়ের মতো চেঁচিও না।”, একজন চিংড়ি বলে উঠলো।
“তুমি তো কখনই ষাঁড়ের কনন্ঠস্বর শোননি।”, আরেকজন বললো।
“তা শুনিনি তা বলে এটা জানি কেউ যদি জোরে চেঁচায় তাহলে তাকে ষাঁড়ের মতো চেঁচানো বলে।”, চিংড়ির জবাব।
আরেকজন বললো, “ওর কথা শুনে রাগ করো না। ও নোন জলের চিংড়ি। মিঠে পানিতে এসেও ওর মেজাজটা মিষ্টি হলো না। এই যে নালা এটার শেষ মাথায় গেলেই দেখবো নালাটা নদীতে মিশে গেছে। সেই নদীর শেষ মাথায় আছে সমুদ্র। তবে তুমি নদীর খাড়িতে যাবার আগেই দেখবে নাকে নোনা গন্ধ আসবে। সমুদ্রের নোনা জল এসে মিশেছে সেখানেই এরপর তোমাকে পাড়ে উঠে হেঁটে হেঁটে যেতে হবে সামনে। দেখবে পাড় উঁচু হয়ে আসছে। সেই উঁচু পাড়ের শেষ মাথায় গেলেই দেখতে পাবে নীচে নীল জলরাশি। ওটাই সমুদ্র।”
নালার জল শেষে যখন সে নদীর মধ্যে এল তখন গভীর রাত। সে ভাবলো, আর পারা যাচ্ছে না একটু জিরিয়ে নেই। এখন কুয়োতে কি হচ্ছে ? ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে স্বপন দেখলো, কচ্ছপটা তাকে বলছে এসো বন্ধু। আমি এখন পাকাপাকি ভাবে কুয়োতে বসবাস করতে এসেছি। বুড়ো সব ব্যাঙেরা বলছে না না ও এখানে থাকলে ঝামেলা হবে। এ কথা শুনে কচ্ছপটা আবার কুয়োর গায়ে উঠে দিল এক লাফ। কুয়োর জল কেঁপে উঠল। তাতে ভেসে গেল ব্যাঙ। ঘুম ভেঙ্গে গেল ব্যাঙের।
“সামাল সামাল নদীতে জোয়ার এসেছে।”, কতগুলো মাছ চেঁচিয়ে উঠেছে।
“সমুদ্রে যেতে চাই।”, সে মাছদের বললো।
“পানির টানের সঙ্গে মিশে যাও। যখন ভাটার টান আসবে নদীর পানি সমুদ্রে যেতে থাকবে।”, মাছেরা বুদ্ধি দিলো অভিযাত্রিককে।
কথামতো স্রোতের সঙ্গে মিশে ভেসে যেতে থাকলো অভিযাত্রিক।
“সামাল সামাল প্রাণ বাঁচাও।”, দূর থেকে সেই ছোটমাছদের চিৎকার শুনে তাকিয়ে দেখে একটা বোয়াল হা করে তার দিকে ধেয়ে আসছে। এই ছুয়ে ফেললো প্রায়। এমন সময় সে ছুড়ে দিল তার বিষ থলি। বোয়াল মাছটার যদি হাত থাকতো তাহলে সারা গা সে চুলকে নিত। বোয়াল মাছটার কি জ্বলুনি। একি তার নি:শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
এই সুযোগে সে এবার পাড়ে ওঠে গেল । একবুক তাজা বাতাস নিল তার বুকে। তাহলে সমুদ্রের কাছে চলে এসেছি। দেথে নদীর পাড় বেশ খাড়া। থপথপিয়ে লাফিয়ে সে উঠলো খাড়া পাহাড়ে। ঘন ঘাসের জঙ্গল ধরে সে সামনে এগুতে লাগলো। দূরে দেখা যাচ্ছে ছোটখাট জঙ্গল। এগিয়ে যাচ্ছে কুয়োর ব্যাঙ। সামনে হচ্ছে সবুজ ঘাসের বোন পাতলা হয়ে আসছে। টুই টুই একটা পাখী। উড়ে আসছে তার দিকে। সমুদ্রের খুব কাছে এসেই কি সে মারা পড়বে। লাফাতে শুরু করলো সে। একবার তার গায়ে ডানা লেগে গেল প্রায়। যদি সে ঘুরে না দাঁড়াতো তাহলে এতক্ষণ চলে যেতে হতে পাখীর পেটে। পাখীটা আবার উড়ে আসছে আরো জোরে। একি সামনে বিশাল খাদ মনে হচ্ছে। অভিযাত্রিক শুয়ে পড়লো মাটিতে। পাখীটা উড়ে গেল তার উপর দিয়ে। তাকে তাড়া করেছে এবার একটা ঈগল। উঠে দাঁড়াতেই সে অবাক। খাড়া পাড়ের ওপাশে অনেক নীচে নীল আর নীল। এত জল। এটাই তাহলে সমুদ্র। এবার সে শুনতে পাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন।...
এখনও আমি কান পাতলে শুনতে পাই সমুদ্রের গর্জন। চোখ বুজলেই দেখতে পাই সাগরের নীল জলরাশী। যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। স্কুলে ব্যাঙাচিদের গল্প শোনাচ্ছিল অভিযাত্রিক। কুয়োর স্কুলের শিক্ষক অভিযাত্রিক তার ছাত্রদের তৈরি করছেন। তারা তৈরি হচ্ছে মহাসমুদ্র অভিযানে যাবার জন্য।
অচিনপুর গ্রামটা বেশ বড়। কিন্তু তারচেয়ে বড় গ্রামের শেষে মাঠটি। আবার মাঠের চেয়েও বড় মাঠের পাশের বন। মাঠের শেষে বনের ধারে একটা বড় কুয়ো আছে। গ্রামের লোকেরা বনে যায়। পথে সেই কুয়োর পানি পান করে। তা না হলে কুয়োটি পড়ে থাকে সারা বছর। কেন এই মাঠের পারে নির্জনে এই কুয়ো? গ্রামের বুড়োরা বলাবলি করে, সে অনেক দিন আগে এক রাজপুত্র শিকার করতে এসে পথ হারিয়ে ফেলে। শেষে মাঠের ধারে এসে পানি না পেয়ে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাজা এরপর মাঠের পাশে এই কুয়োটি খনন করে দেন, যাতে কেউ বনের ধারে এসে পানির পিপাসায় কষ্ট না পায়। তবে কালেভদ্রে লোকেরা এখানে আসে।
দেখতে দেখতে কুয়োটাও বেশ ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু কুয়োর ভেতরটা অনেক গভীর। অনেক নীচে এর জল। সেই জলে শ্যাওলা, ফার্ণ ইত্যাদি জন্মে জঙ্গল হয়েছে। জলের পোকা, মাছ আর কিছু ব্যাঙ এসে বাসা বেঁধেছে সেই জঙ্গলে। কুয়োর তলে তারা আরামেই বাস করে। কুয়োতে জলও বেশ। যখন চারপাশ গরমে শুকিয়ে যায়, তখনও কুয়োর জল শুকায় না। দু-একটা ব্যাঙ মাছের ছানাদের ধরে খায়। মাছেরাও দু-একট ব্যাঙাচিকে টুপ করে মুখে পুরে নেয়। এই টুকু গোলমাল ছাড়া কুয়োটা একেবারে শান্ত। মাছ আর ব্যাঙ মিলে কুয়োর জঙ্গলে আরামে দিন কাটায়।
রাতের বেলা বুড়ো ব্যাঙ দাদু নেমে আসে জলে। ব্যাঙাচিদের গল্প বলে। কবে কোন ব্যাঙ কুমার এক রাজকন্যাকে খুঁজতে গিয়ে খুঁজে পেল এই কুয়ো। ব্যাঙাচিদের দল মনে মনে ভাবে সেই হবে সেই রাজকুমার। কিন্তু দু-একজন কুয়োর দেয়াল বেয়ে উঠতে গিয়ে দেখে যে ভারী পিছল সে দেয়াল। রাতে তারা গল্প শুনে আর সকালে শ্যাওলার বনে পণ্ডিত ব্যাঙের পাঠশালায় যায়। পুরনো পুঁথি খুলে শিক্ষক বলেন, “এই যে দেখছ এটা আমাদের পৃথিবী।”
“কিন্তু বুড়ো দাদু যে বলে, ব্যাঙ রাজপুত্র অন্য কোথা থেকে এসেছে!”, কৌতুহলি নামে এক ব্যাঙ প্রশ্ন করে।
“বুড়োটা রাজ্যের আজগুবি গল্প জানে। ওর কথার না আছে মানে না আছে মুণ্ডু।”, শিক্ষক বলে।
এতে দমে যায় না কৌতুহলি। ওকে সবাই কৌতুহলী বলে ডাকে। কারন সব সময়ই সে প্রশ্ন করে। তার প্রশ্নের জবাব জানে না অনেকেই। তাই তারা বিরক্ত হয়। বলে, “দুর বাপু ! এই সব প্রশ্নের উত্তর জেনে আমাদের কি লাভ? আমাদের এটাই পৃথিবী। এখানে আমরা আরামেই আছি। এর বাইরে যাওয়ার কি দরকার। এত প্রশ্নের উত্তর জেনেই বা লাভ কি?
বুড়ো দাদুকে সে প্রশ্ন করে, “এটাই কি পৃথিবী?”
বুড়ো দাদু বলে, “না না, এই কুয়োর বাইরে আছে মাঠ। তার পরে আছে গ্রাম।”
কৌতুহলী বলে, “তুমি কি ভাবে জানলে?”
বুড়ো দাদু বলে, “যখন আমার বয়স কম একবার কুয়োটা পার হবার চেষ্টা করেছি। মাঠ আর গ্রামটা চোখে পড়ে বটে। কিন্তু গ্রামের মানুষদের মারামারি দেখে আমি পালিয়ে কুয়োর ভিতর আবার চলে আসি।”
কৌতুহলি আরো জানতে চায়। কিন্তু সে তাকিয়ে দেখে বুড়ো দাদু ঘুমিয়ে পড়েছে।
পাঠশালায় সে গিয়ে শিক্ষককে বলে, “আমাদের এই কুয়োর বাইরে কি আর কোন কিছু নেই।”
শিক্ষক বলে, “থাকতে পারে, কিন্তু আমার তা জেনে কাজ কি? তোমারই তা জেনে কাজ কি? তারচেয়ে শেখ কীভাবে ব্যাঙাচি থাকতে লেজ নাড়াতে হয়। লেজ খসে গেলে কিভাবে দুই পায়ে সাঁতার কাটতে হয়।”
“কিন্তু এর বাইরে যারা আছে?”, কৌতুহলীর কৌতুহল ভরা প্রশ্ন।
শিক্ষক জবাব দেয়, “দেখ অন্য পৃথিবী থাকুক অন্য জায়গায়, কুয়োর ব্যাঙদের এত কৌতুহল ভাল নয়। আর আমাদের এই কুয়োটাই আমাদের পৃথিবী। এটা কত সুন্দর দেখেছো।”
কৌতুহলী ভাবতে ভাবতে একদিন বুড়ো হয়ে যায়। আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে সে ভাবে চাঁদেও কি ব্যাঙ বাস করে?
বুড়ো হয়ে সেও ব্যাঙাচিদের পাঠশালার শিক্ষক হয় একদিন। ব্যাঙাচিরা লেজ দুলিয়ে তার কাছে পড়তে আসে। কৌতুহলি বলে, “এই যে দেখছ এটা আমাদের দেশ। আমাদের ঘর।”
একজন তাকে প্রশ্ন করে, “এটাই কি আমাদের পৃথিবী?”
কৌতুহলী বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, এটাই আমাদের পৃথিবী।”
যে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় সেই হল এখনাকার পালের গোদা। তাকে সবাই অভিযাত্রিক বলে ডাকে। সাহস খুব বেশি। সে মাঝে মাঝে চলে যায় ঘন শ্যাওলার জঙ্গলে।
সে আবার প্রশ্ন করে তার শিক্ষককে, “আচ্ছা আমি যদি এই কুয়োর উপরে উঠি তাহলে কি দেখতে পাব?”
“একটা মাঠ।”, তার শিক্ষকের জবাব।
“তারপরে?”, অভিযাত্রিকের প্রশ্ন।
“তারপরে একটা গ্রাম।”, শিক্ষকের জবাব।
“আর গ্রামের উল্টোদিকে, সেখানে আছে ঘন জঙ্গল। তারপরে কি আছে ব্যাঙরা কেউ জানে না।”
কৌতুহলী তার ছাত্রের কথায় তাকে জানায়, “একদিন সেও এই মাঠ পড়ি দিতে চেয়েছে। কিন্তু পথে অনেক বিপদ তাই সে আবার কুয়োতেই ফিরে এসেছে।”
ব্যাঙাচিরা কুয়োর তলায় ব্যাঙ লাফ খেলে। অভিযাত্রিক বলে সে একদিন এই কুয়োর উপর উঠব। পৃথিবীকে দেখবে। বন্ধুরা বলে, সর্বনাশ। এখনও তো লেজ খসেনি। বাবা মা বলে, “এ রকম পাগলামি করবি তো মরবি।”
অভিযাত্রিক অপেক্ষায় থাকে তার লেজ খসার। নইলে সে পৃথিবী দেখতে পারবে না। বুড়োরা কুয়োর ফাটলে বসে গল্প করে আর বলে, “কুয়োটা কত বড় আর সুন্দর!”
আর এদিকে কুয়োর শান্ত জলে ছোটরা খেলে বেড়ায়।
তবে অভিযাত্রিক চায় এই কুয়োতে একটা কিছু ঘটুক। একদিন জলে তোলপাড় উঠল। জলের ঢেউয়ে সবাই দুরে সরে যায়। বুড়োরা লুকায় ফাটলে, আর ব্যাঙাচিরা শ্যাওলার জঙ্গলে। ঢেউ শান্ত হয়ে এলো। জলে একটা প্রাণী ভেসে আছে। গা দিয়ে রক্ত পড়ছে। তার মাথাটার চেয়ে শরীরটা বড়, আর পীঠের মধ্যে একটা বড় ঢাকনা। যদিও প্রাণীটা তেমন নড়ে না চড়ে না। বুড়োরা কিন্তু সবাইকে বললো, “সাবধান!”
দু-একজন তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে। “ও কিন্তু তোমাদের খেয়ে ফেলবে”, বুড়োদের হুঙ্কারে আবার পিছিয়ে যায় সাহসীরা।
জীবটা শ্যাওলা ছাড়া আর কিছুই খায়নি। সাহস নিয়ে তার কাছে এগিয়ে গেল অভিযাত্রিক। গুটি গুটি লেজে সাঁতার কেটে সে প্রাণীটাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কে?”
“আমার নাম কচ্ছপ। আমি দূর সমুদ্রে যেতে চাইছিলাম। কিন্তু চিল আমাকে উঁচিয়ে শূন্যে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখান থেকে পালাই। আবার ঈগল ধরে খেতে চায় আমায়। পালাতে গিয়ে এই এই জলের ভেতর পড়েছি। আমি এখন আহত এবং ক্লান্ত।”
অভিযাত্রিকের দেখাদেখি অন্য ব্যাঙাচিরা এসে ভিড় জমায়। তারা আসে কচ্ছপের সঙ্গে গল্প করতে। কচ্ছপও যে কত রকমের গল্প জানে! সে বলে, “আমি হলাম কচ্ছপ। আমাদের বাস গভীর সমুদ্রে।”
“সমুদ্র কি কুয়োর চেয়ে বড়?”, একজন ব্যাঙাচি জানতে চায়।
“সমুদ্র কুয়োর চেয়ে অনেক বড়। সেখানে এত জল যে গুনে শেষ করা যাবে না। সেখানে আছে ছোট্ট তারা মাছ। আছে বিশাল নীলতিমি। কত হাজার হাজার রকমের প্রাণী যে সেখানে, বলে শেষ করা যাবে না।”
“তুমি কি সমুদ্র দেখছ?”, ব্যাঙাচিদের একজন জানতে চায়।
“না না এখন আমি সমুদ্র দেখিনি? কিন্তু আমার বাবা মা যখন ডিম পাড়ে তখন ডিমের কানে কানে যে কথা বলে, তাতেই আমরা সমুদ্র সমন্ধে ধারণা পেয়ে যাই।”
“তোমাদের বাবা মা তোমাদের সঙ্গে থাকে না?”, আরেক ব্যাঙাচি জানতে চায়।
“আমাদের বাবা মা ডিম পাড়ার সময় হলে সমুদ্রে থেকে ডাঙ্গায় আসে। তারপরে সেখানে ডিম পেড়ে চলে যায়। বালুতটে ডিম ফুটে আমরা বাচ্চা কচ্ছপ বের হই। সেই বালুতটে থেকে রওনা দেই সমুদ্রের দিকে। সমুদ্রে যাওয়ার আগে আমাদের নানা বিপদ পাড়ি দিতে হয়। অনেক প্রাণী আসে আমাদের খাবার জন্য। কত বিপদ? সব তুচ্ছ করে আমরা যেতে থাকি। পথে মারা পড়ে অনেকে। শেষ পর্যন্ত যারা টিকে থাকে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে সমুদ্রে।”
“তুমি এখানে কেন?”, একজনের প্রশ্ন।
“আমি সমুদ্রেই যাচ্ছিলাম। এক চিল আমাকে ছোঁ মেরে তুলে নেয়। সে যখন উড়ে তার বাসার দিকে যাচ্ছে তখন তার পিছে লাগে এক ঈগল। সে চিলকে তাড়া করে। তার থাবা থেকে পড়ে আমি যখন পালাতে যাই। আর তখন আমাকে তুলে নেয় ঈগল পাখি। সেই ঈগলকে আবার তাড়া করে আরেকটা বড় ঈগল তখন সে আমাকে এই কুয়োর মধ্যে ফেলে দেয়।”
“সমুদ্রে যাওয়ার জন্য এত ঝক্কি?”, ব্যাঙাচিরা বলে।
“হ্যাঁ, সমুদ্র অনেক বড়। সেখানে যত বিপদই হোক আমাদের যেতেই হবে।”, বলে কচ্ছপ তার গল্প শেষ করে।
বুড়োরা ব্যাঙাচিদের যতই মানা করুক, ব্যাঙাচিরা ঠিকই কচ্ছপের গল্প শুনতে যায়।
তারপরে স্কুলে এসে প্রশ্ন করে, “ও মাষ্টার মশাই আমাদের বাবা মা কি মাটিতে ডিম পাড়ে?”
কৌতুহলি উত্তর দেয়, “না আমরা ব্যাঙেরা দুইভাবে জীবন যাপন করি।”
“সে কিরকম ?”
“ব্যাঙেরা পানি বা পানির বাইরে দুই জায়গায় জীবন কাটাতে পারে। ডিম পাড়ার সময় ব্যাঙ পানিতে গিয়ে ডিম পাড়ে। সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় ? সেই বাচ্চারা হলে তোমরা ব্যাঙাচিরা। যখন তোমাদের লেজ খসে পড়বে, তখন তোমরা ব্যাঙ হবে। তোমরা তখন মাটিতে চলাফেরা করতে পারবে?”
“কে তোমাদের ডিমের কথা বলেছে?”, কৌতুহলি জানতে চায়?
“কচ্ছপ!”, একসাথে সব ব্যাঙাচি উত্তর করে।
বুড়োরা শংকিত হয়ে ওঠে। কচ্ছপটা কি তাদের ছেলেদের মাথা চিবিয়ে খাবে?
“আজ তোমাদের শোনাবো কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড়ের গল্প...”, কচ্ছপ শুরু করে।
“খরগোশ কেমন?”, একজন ব্যাঙাচি বলে
“তোমরা কুয়োর ভেতর থেকে দেখি পৃথিবীর কিছুই দেখনি? খরগোশ হলে আমাদের মত চার পায়ের প্রাণী। তারা খুব জোরে দৌড়াতে পারে।”
“তারা কি সাঁতার কাটতে পারে?”, আরেকজন জানতে চায়।
“তারা সাঁতারে তেমন দক্ষ নয়। তবে তাদের কান খুব খাড়া। আচ্ছা যা বলছিলাম, যেহেতু খরগোশেরা খুব জোরে দৌড়ায় তাই তাদের খুব বড়াই। তারা একবার কচ্ছপকে বললো, তোমরা আমাদের সঙ্গে দৌড়ে কখনই পারবে না। আমাদের মধ্যে এক কচ্ছপ বললে, ঠিক আছে আমি তোমার সঙ্গে দৌড়ের প্রতিযোগিতা করবো। অনেকেই ভয় পেল । কিন্তু সাহসী কচ্ছপ বললো, হারিজিতি -দৌড়াতে রাজি।
দৌড় শুরু হবার সাথে সাথে খরগোশ কয়েক লাফে অনেক দুর চলে গেছে। পেছন ফিরে সে দেখে,কচ্ছপের কোন দেখাই নেই। সে ভাবলো, কচ্ছপটা আমাকে ধরতে যখন পারছে না। একটু ঘুমিয়ে নেই। খরগোশ ঘুম থেকে উঠে দেখে কোথাও কচ্ছপ নেই।
যা বাবা এত আস্তে চলে, যাকগে আমি আবার দৌড় শুরু করি, বলে খরগোশ আবার দৌড়াতে শুরু করে। যখন দৌড় শেষে করছে, সে দেখে, কচ্ছপ আনেক আগে এসে হাজির।
বুঝলে বন্ধুরা, সাহস কর। ধৈর্য্য ধর। জিত তোমারই। যেমন জিতেছিল আমাদের কচছপ।”
গল্পর আসর জমে উঠলো ছেলেদের। বুড়োরা ঠিক করলো কচ্ছপটাকে বের করে দেবে। কিন্তু কার গায়ে এত জোর। ছোটদের বলা হল, তারা যেন আর কচ্ছপের সঙ্গে না মেশে। তবু একজন ঠিকই মেশে।
তুমি খুব সাহসী ছেলে অভিযাত্রিক, “কচ্ছপটা বলে?”
“হ্যাঁ আমি সমুদ্র দেখতে চাই।”
“তুমি সাহসী। কিন্তু মনে রেখ সমুদ্র এখান থেকে অনেক দুরে। যাবার পথে, পদে পদে বিপদ। তুমি কুয়ো থেকে কখনই বের হওনি। তোমার জন্য ও পথ আরো ভয়ংকর। সবচেয়ে বড় কথা তুমি তো সমুদ্রে বাস করতে পারবে না। সেখানকার জলে লবন ভরা। সেই জলে তুমি নিঃশ্বাস নিতে পারবে না।”
“তবুও আমি দেখতে চাই সমুদ্র কত বড়?”
“সমুদ্র অনেক বড়। পৃথিবীতে তিনভাগ জল আর একভাগ মাটি। সেই জল আছে সমুদ্রে আর মহাসমুদ্রে।”
“আমি তোমার সঙ্গে যাব?”, অভিযাত্রিক বলে।
“তুমি সমুদ্রে বাস করতে পারবে না। দূর থেকে দেখতে পারবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা এখন তেমার লেজ খসেনি লেজ না খসলে তুমি ডাঙ্গাতে উঠতে পরবে না ? আর তোমাকে অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে সমুদ্রে যেতে হবে? আমি এখানে আর বেশিদিন থাকতে পারবো না।”
“আমি যেভাবেই হোক একদিন সমুদ্র দেখবো।”
“তোমার দৃঢ় ইচ্ছা আছে। একদিন তুমি অবশ্যই সমুদ্র দেখবে। দেখ কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে। আমরা শরীরও ঠিক হয়ে উঠছে। কালকে আমি চেষ্টা করেছি এই কুয়োর দেয়াল বেয়ে উঠতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। আজ আবার চেষ্টা করবো। বিদায় বন্ধু। শুভরাত্রি।”
পরের দিন সকালে কচ্ছপটাকে আর দেখা গেল না। অভিযাত্রিক মন খারাপ করলো বটে আবার খুশিও হল। কচ্ছপ রওনা দিয়েছে সমুদ্রের পানে।
বুড়োরা বললো, “ভালই হয়েছে। আপদ বিদায় হয়েছে।”
দুই পূর্ণিমা পার হয়েছে। অভিযাত্রিক দেখলে তার লেজ মিলিযে গেছে। সে ব্যাঙাচি থেকে হয়ে গেছে ব্যাঙ। খুশিতে আত্মহারা সে। আমি এখন জলের বাড়ী ছেড়ে ডাঙ্গায় উঠতে পারবো।
“খবরদার। সাবধান জলের বাড়ী ছেড়ে ডাঙ্গায় বেশিক্ষণ থাকলেই বিপদ।”, কে বলছে দেখতে গিয়ে দেখে, বুড়ো ব্যাঙ দাদু।
আকাশ ভরা পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে পড়েছে কুয়োতে। সেই আলোয় ভেসে গেছে সব। পানির নীচে বসে মাথার উপর তাকিয়ে দেখে। পুরো চাঁদ হাসছে। কুয়োর তলায় জলের মাঝে শ্যাওলার বনে ঘুমিয়ে আছে মাছেরা। কুয়োর কোটর থেকে ভেসে আসছে ব্যাঙদের নাক ডাকার শব্দ। আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। কেমন শান্ত চারিধার। কুয়োর তলায় বালুরেখায় আলো চিকচিক করছে। পুরনো ব্যাঙের ছাতায় ঘুমাচ্ছে ব্যাঙ দাদু।
আর দেরি নয়, রওনা দিতে হবে। কুয়োর ফাটলে একটা পা রেখে উপরে ওঠার চেষ্টা করলো অভিযাত্রিক। জলে মৃদু আলোড়ন। পা পিছলে পড়ে গেছে অভিযাত্রিক। কেউ জেগে গেল নাতো? আবার চেষ্টা করা যাক।
“ও পথ দিয়ে তুমি কুয়োর উপরে উঠতে পারেবে না।”, অভিযাত্রিক চমকে উঠলো। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে, তার শিক্ষক কৌতুহলী।
“ও পথটা খুবই পিচ্ছিল। ও পথে উপরে ওঠা সহজ নয়। অনেক আগে আমি ও পথ দিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করেছি। পরে খুঁজতে গিয়ে আমি আরেকটা রাস্তা বের করেছি। ওই ফাটলের পথ দিয়ে অনেক গাছপালা গজিয়েছে। ওটা ধরে তুমি উপরে উঠে যেতে পার।”
কৌতুহলীর উঠছে পেছনে অভিযাত্রিক। কৌতুহলীর বয়স বেড়ে গেছে। সে খানিকটা বিশ্রাম নেয়। আবার এগিয়ে যায়। কুয়োর উপরে উঠে তারা নিচের দিকে তাকালো।
কৌতুহলী বলতে থাকে, “নীচ থেকে কুয়োটাকে কেমন যেন অন্য রকম লাগে, তাই না। আমারও শখ ছিল একদিন পৃথিবী দেখবো। খুঁজে খুঁজে এই পথ বেয়ে এই পর্যন্ত এসেছিলাম। এখান থেকে নীচে তাকিয়ে দেখি আমাদের কুয়োটা কত সুন্দর। পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়তে আর মন করলো না। তোমার সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছে। তুমি যেতে চাও। আজ তোমার সাথে আমরাও যাবার ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু আমি বুড়ো হয়ে গেছি। পথে হাঁপিয়ে পড়বো। আমাকে নিয়ে বিপদে পড়ে যাবে। পথে যে অনেক বিপদ। সাপ, পাখি, এরা আমাদের শত্রু। সাথে আরেকটা শত্রুর কথা মনে রেখ। দু পায়ের মানুষ। তারাও তোমার ক্ষতি করতে পারে। যদি ফিরে আসো, আমাকে শোনাবে সমুদ্রের গল্প। যাও আর দেরি নয়, বেড়িয়ে পড়।”
এক লাফে কুয়া থেকে নেমে পড়লো মাটিতে অভিযাত্রিক। পড়লো ঘাসের উপর। কুয়োর পাশের ঝিঁ ঝিঁ পোকা বলে উঠলো, “এই কে রে আমার ঘুম ভাঙ্গালো।” কিন্তু আশে পাশে কাউকেই দেখতে পেল না অভিযাত্রিক।
তবে যেখান থেকে আওয়াজ এলো সেখানে গিয়ে সে বললো, “আমি দু:খিত।”
“সাবধান! জোরে চেঁচিও না। আশেপাশে অনেক বকের বাসা। তোমার কথা শুনতে পেলে তোমাকে খেয়ে ফেলবে।”, ঘাসের ভেতর থেকে একটা ব্যাঙ মাথা বের করে বললো। “ও তোমার সঙ্গে পরিচয় হয় নি। আমার নাম কুনো। দেখতেই পাচ্ছ আমি তোমার স্বজাতি। রাতের বেলায় গলা ছেড়ে গান গাইতে নেই। তবে বৃষ্টি এলে এমনিতেই গলা খুলে যায়। গলা খুলতে ভয় পাই। এই সেদিন আরেকটু হলেই গেছিলাম আর কি? পাতার কাঁপন দেখে ভাবলাম ওখানে কি ? দেখি একটা সাপ আপন মনে হিস হিস করছে। মুখে কোন কথা নেই। নিঃশ্বাস যেন না শুনতে পায়। জোরে কথা বললেই যাবে সাপ নয় তো পাখির পেটে।”
“আমি অভিযাত্রিক।”, নিজের পরিচয় জানায় কুনোকে। “আমি থাকি ওই কুয়োর ভেতর। কিছুদিন আগেও আমি ব্যাঙাচি ছিলাম।”
“ও তাহলে তুমি আমার চেয়ে ছোট। আমি ওই যে পাশের জঙ্গলে জন্মেছি। ওখান থেকে এখান এদিকে এসেছি। যদি কোন পোকামাকড় পাই। ওখানে একটা সাপ ঘোরাঘুরি করছে। তোমাকে দেখলাম তুমি ওই কুয়োর উপর থেকে লাফ মারলে। তা কোথায় যেতে চাও?”, কুনোটা বললো।
“আমি সমুদ্র যাত্রায় বেড়িয়েছি।”, অভিযাত্রিক বললো।
“তুমি জানো সমুদ্র কোন দিকে?”, কুনোর জিজ্ঞসা ?
মাথা নাড়লো অভিযাত্রিক।
কুনো বললো, “আমার ধারণা সমুদ্র পূর্ব দিকে হতে পারে। যদি পুর্ব দিকে না হয় তবে অবশ্যই তা পশ্চিমে। আর পশ্চিমে যদি না হয় তাহলে তা অবশ্যই উত্তরে। যদি দেখ যে উত্তর দিকে সমুদ্র নেই তাহলে তা অবশ্য দক্ষিণ দিকে পাবে। যে দিকেই যাও সমুদ্র।”
“সমুদ্র তাহলে চারদিকে?”, অভিযাত্রিক জিজ্ঞেস করে।
“অবশ্যই চারদিকেই সমুদ্র। তবে আমার মনে হয় জঙ্গলের ধারে নদী। তার পাড় দিয়ে গেলে সমুদ্র পাওয়া যাবে। যেতে যেতে একসময় মাটি শেষ। সেটাই সমুদ্রের পাড়। সমুদ্র বিশাল। সমুদ্রের চেয়ে বড় হলো মহাসমুদ্র। আচ্ছা তুমি সমুদ্রে যেতে চাও কেন?”
“আমি দেখতে চাই সমুদ্র, আকাশ, পৃথিবী। এটা আমার কৌতুহল। সমুদ্রের নীল জল কেমন?”
“শুধু কৌতুহল। বটে জীবন বাজী রাখছো। দেখ তোমাদের কুয়োর জগত সমন্ধে জানিনা। আমি তো ভাবি সেখানে অনেক আরাম। আমারই তো মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চারপাশ দেখা বাদ দিয়ে কুয়োর মধ্যে ঝাপ দিয়ে ওর জলেই কাটাই। যাকগে, যা এক পূর্ণিমায় হয় না তা কোন পূর্ণিমায় নয়। তুমি যদি জঙ্গলের ধার দিয়ে নদীর পার দিয়ে যাও। আমি তোমার সঙ্গে নদীর ধার পর্যন্ত যেতে পারি। নদীর ধারে আমার মামাতো ভাইয়ের চাচাতো ভাই এর বাস। তাকে অবশ্য আর দেখা যাবে না। সাপে খেয়ে ফেলেছে তো তাই। তার ছেলেমেয়েদের অন্তত একটু সান্তনা দিতে পারি।”
অভিযাত্রিক আর কুনো রওনা দিল। আকাশে চাঁদ ঠিক মাথার উপর।
“যে পথ দিয়ে যাব, সেখানে আছে নানা বিপদ। চোখ কান খোলা রেখে চলতে হবে।”, বলতে বলতেই কুনো ব্যাঙ ঝপাত করে পড়ে গেল একটা পচা ডোবায়।
“এহ আরেকটু হলেই শিং মাছটা গুতিয়ে দিত।”, ডোবার পচা পানি মুখ থেকে বের করে কুনো ব্যাঙ বলল। “যা বলছিলাম সাবধানে চলবে?”
ডোবাতে অনেক ব্যাঙ দেখা গেল। তারা জানালো কয়েকদিন বৃষ্টি হয়নি। তারা গলায় জোর পাচ্ছে না। বৃষ্টি না হওয়াতে আমারও চোখের জোর কমে গেছে। মনে রেখ রাতের বেলায় চলাটাও সহজ নয় মোটেও।
চাঁদের আলোয় বনটা যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠছে। গাছপালা সব ঘুমিয়ে আছে। জেগে আছে ঝিঁ ঝিঁ পোকা। সব সময় অভিযাত্রিক দেখেছে মাথার উপর চাঁদ। তারপর সে হারিয়ে যায়। আজ দেখতে পাচ্ছে চাঁদও তাদের সঙ্গে যাচ্ছে।
“মুগ্ধ নয়নে তাকিও না, চাঁদের দিকে তাকানোর কি আছে। ওটা একটা মাকাল উপগ্রহ। ব্যাঙদের বসবাসের অযোগ্য। আমার জ্যোতিষ চাচা তো চাঁদ দেখলে ভারী বিরক্ত। চাঁদের কারনে তারাদের ঠিকমতো দেখা যায় না।”
“তবুও চাঁদ সুন্দর।”, অভিযাত্রিক বললো।
“দিনের বেলায় চাদকে দেখা যাবে না। তখন আমরা কোন গর্তে লুকাবো। পাতার অড়ালে লুকোতে পারি।”
কুনো ব্যাঙ বলেই চলছে, “দিনের বেলা। আমার মামাতো ভাইয়ের চাচাতো ভাই পোকা ধরার জন্য বের হয়েছে। অমনি সাপে খেয়ে ফেলেলো। দেখ দেখি সাপদের কেমন ব্যবহার। আমাদের ধরে ধরে খেয়ে জীবন ধারণ করতে হবে? আমরা অবশ্য পোকা খাই। কিন্তু ভেবে দেখ অমরা যদি পোকাদের না খেতাম তবে পোকার বংশে পৃথিবী ভরে যেত? ঠিক কিনা বল?”
“দেখ শুনে , সাপের গর্তে ব্যাঙের পা যেন না পড়ে, তুমি নিশ্চয়ই এই প্রবাদটা শুনেছো।”, কুনো জবাবে মাথা নাড়লো অভিযাত্রিক। “মানে ভূল জায়গায় পা না দেওয়া। এই যে যেমন মানুষেরা বলে কুপমুন্ডক। তার মানে জানো তো। তার মানে হল কুয়োর ব্যাঙ, যে কিছু জানে না, মানুষ নিজেই অনেক সময় নিজের ঘর ছেড়ে বের হতে চায় না। আমার খালাতো ভাইয়ের ফুপাতো ভাই মানুষদের পাঠশালার স্কুলের পেছনে বাস করে তার কাছ থেকেই এ সব শুনেছি।”
হঠাৎ কুনো “লুকাও লুকাও” বলে দুই লাফে সামনের ঘাসের ঝোপে আড়াল হল।
অভিযাত্রিক কিছু না বুঝেই দৌড় দিলো।
আড়ালে এসেই কুনো হাফাতে হাফাতে বললো, “শুনতে পাচ্ছ?”
অভিযাত্রিক কান পেতে শোনার চেষ্টা করলো। একটা শব্দ শুনতে পেয়ে বললো, “ওটা কিসের শব্দ?”
“ওটা হল ডানার শব্দ। চামচিকেরা বের হযেছে খাবারের সন্ধানে।”
“বাঁচাও বাঁচাও”, বলে একটা শব্দ শুনতে পেল তারা, তারপর সব ঠান্ডা। অভিযাত্রিক ছুটে বের হতে যাচ্চিল কিন্তু তাকে আটকে দিল কুনো ব্যাঙ। তুমি ওই হতভাগা ব্যাঙটাকে তো বাঁচাতে পারতে না, তার বদলে তারই খাদ্যে পরিণত হতে।
“অনেক হয়েছে চল, এবার ওই ঝোপোর আড়ে ঘুমিয়ে থাকি। তারা দুজনেই অবশ্য ঘুমানের আগে কয়েকটা ঘাস ফড়িং খেয়ে ফেললো?”
রাত ভোর হয়ে আসছে, কুনোটা হাই তুলছে। হঠাৎ চোখ এক ঝলক আলো এসেছে। এতদিন কুয়োর ভেতরে থেকে যে আলো দেখেছে এটা সে রকম আলো নয় ? ওটাই সূর্য অভিযাত্রিক অবাক হয়ে তাকায়।
“ওভাবে তাকালে চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।”, কুনোটা ঘুমিয়ে পড়ার আগে তাকে সাবধান করে দিল।
অনেক হয়েছে কুনোর ডাকে ঘুম ভাঙে অভিযাত্রিকের। বেলা পড়ে আসছে। “চলো রওনা দিই ?”
“তার আগে আমরা চল ওখান থেকে কিছু পোকা ধরে খাই। বেশি আবার খেয়ে ফেল না তাহলে রাস্তায় চলতে পারবে না।” ঘাসের জঙ্গল ছেড়ে এবার তারা ঢুকে পড়লো গাছপালার জঙ্গলে। ছোট ছোট গাছের শেকড় বাঁধা হয়ে দাড়াচ্ছে। “এই যে রাস্তাটা দেখছ এটা দিয়ে সমুদ্রের ধারে যাওয়া যায়।”
কুনো ব্যাঙের কথায় অভিযাত্রিক বললো, “তাহলে আমরা সেই রাস্তা ধরে চল যাই।”
খবরদার সেই রাস্তায় যাওয়া যাবে না। তার চেয়ে আমরা গাছের ফাঁক দিয়ে রাস্তা বের করে যাব। তারা লাফাতে লাফাতে একা উঁচু ঢিপির উপর উঠলো।
“আহ হা আপনাদের দেখে আমার কি ভালো লাগছে? আসুন আপনাদের স্বাগত জানাই।”, ঠিক তার সামনের ঢোঁড়া সাপ। সাপের আহবান যেন অভিযাত্রিক এড়োতে পারছে না, কেমন যেন এক অদ্ভুত টানে তার মুখে চলে যাচ্ছে সে।
“তাহলে সমুদ্র দেখার এখানেই ইতি!”, বলে তাকে একটা ল্যাঙ মেরে কুনোটা লাফ দিল। দুজনেই গড়িয়ে পড়লো একেবারেই সেই ঢিপির গোড়ায়। আবার উল্টো দিকে দৌড়। দ্রুত এগিয়ে আসছে ঢোরা সাপ। তাদের কাছে এসে পড়েছে প্রায়। এমন শেষ বারের মত পৃথিবীকে দেখে নিতে হবে হায় পৃথিবী বিদায় ? বলে অভিযাত্রিক চোখ মুদল, সে শুনতে পাচ্ছে বাঁচাও বাঁচাও, একি এতো কুনো ব্যাঙের কন্ঠস্বর নয়। সে চোখ মেলে দেখে ঢোরা সাপটাকে গিলে খাচ্ছে একটা গুই সাপ।
“আহা চোখের সমানে খেয়ে ফেললো! অবশ্য এটাই প্রকৃতির নিয়ম। একজন আরেকজনের খাদ্য।”
কে বলছে কথাটা? এটা বের করার চেষ্টা করতে দেখে গাছের উপর পাতার একটা লাল পিঁপড়া আওয়াজ দিচ্ছে।
“আহা গাছ থেকে কথা বলছ একটু নীচে নেমে আস তোমার সঙ্গে আলাপ করি?”
কুনোর আওয়াজে পিঁপড়া বললো, “ও টি হচ্ছে না। আমি নিচে নামি আর তুমি তোমার জিহবা দিয়ে আমায় খেয়ে ফেল না! ওটি হচ্ছে না।”
“আমার দিকে ওভাবে চেয়ো না, তোমরা বাপু আমার দিকে পানে এভাবে তাকিয়ে দেখ না। কাউকেই বিশ্বাস নেই। অবশ্য এটাই নিয়ম জ্যান্ত অবস্থায় তোমরা আমাদের খাও আর মরার পর আমরাও তোমাদের খেয়ে শেষ করি।”, বলে সে গাছের মগডালের দিকে রওনা দিল।
“আহ কী লাফটাই না দিলে। ভাবছি অলিম্পিকে ব্যাঙ লাফ প্রতিযোগিতায় তোমাকে পাঠাবো। চল যেতে থাকি।”
হাঁটতে হাঁটতে লাফাতে লাফাতে তারা এল এক ঝর্নাও ধারে নালার পাশে।
“অনেক দৌড়া দৌড়ি হয়েছে। একটু জিরোই।”, বলে কুনো ব্যাঙ বসে পড়লো। তারপর শোনা যেত থাকলো তার নাক ডাকার শব্দ। অভিযাত্রিক বসে বসে ভাবতে লাগলো কুয়োর কথা, বন্ধুদের কথা, বাবা মার কথা, কৌতুহলীর কথা। ভাবতে ভাবতে কখন যে দু চোখ এক হয়ে এল টেরই পেল না। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ কুনোর জোরে জোরে ডাকে এবার ঘুম ভাঙ্গলো তার। আকাশে মেঘ জমে এসেছে। তাই জোরে জোরে ডাকছি। সামনেই বর্ষা নামবে, তাই ব্যাঙের ডাকটা একটু অনুশীলন করে নিচ্ছি। আহ বুঝলে কিনা বর্ষা এলেই আমাদের গলার আওয়াজ বেড়ে যায়।”, বলেই দুজন ডাক ছেড়ে ডাকতে থাকে। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ।
“কী বাছারা এত ফুর্তি কেন?”, নালার পাশে গর্ত থেকে মাথা বের করে এক কোলা ব্যাঙ মুখ বার করে কথা বলছে। “দিদিমা তুমি তো জানে না, বর্ষা এলে আকাশ থেকে পানি পড়ে।” অভিযাত্রিক উত্তর দিলো।
“কোথাকার ছোকরা রে তুই আমরা এখানেই সব সময়ই উপর থেকে পানি পড়ে। দশ চন্দ্রমাস কাটিয়ে দিলাম আর আমাকে জ্ঞান দিতে এসেছে।”, বলে আবার গর্তে মাথা ঢুকিয়ে নেয় কোলা ব্যাঙ।
“বুঝলে হে অনেকই আছে গর্তেও মধ্যে বাস করে ধরে নেয় পৃথিবীর সব কিছুই সে জানে।”
“এদের বলা উচিত কী বল তো?”, কুনোটা জানতে চায়।
“অবশ্যই গর্তমুন্ডক।”, অভিযাত্রিক এর কথায় উভয়ে হেসে ওঠে।
তারা নালা ধরে এগিয়ে যায়। রাত হয় অবাবার ভোর হয় আবার তারা বিশ্রাম নেয়। আকাশে মেঘের আনাগোনা বাড়ে। তারা আকাশের দিকে তাকায়। কুনো ব্যাঙ বলে, “বর্ষা পুরোপুরি নামার আগেই আমাদের পৌঁছাতে হবে। বর্ষা নামলে নদী তে বান ডাকবে। সেই বানে তুমি ভেসেও যেতে পার।”
“ও ঠিকই বলেছে।” নালার শেষে একটা পোনা মাছ ধারে এসে বলছে। “তা তোমরা নদীর পার ধরে কোথায় যেতে চাও।”
“ও যেতে চায় সাগর দেখতে আর আমি চলছি আমার মামাতো ভাইয়ের চাচতো ভাইয়ের ছানা পোনাদের দেখতে। তা সব ভালো তো।”
“আর ভালো কই ? এই মানুষেরা আশেপাশে এসেছে। জাল পেতে বড়শি দিয়ে তারা অনেক মাছ ধরে নিয়ে গেছে। তোমাদের সাবধান করি ওরা কিন্তু এখনও আশেপাশে আছে। বলে পোনা মাছ চলে গেল আরো নালার জলে।”
দুই ব্যাঙ আবার হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে তার এসে পৌঁছল নালার বাঁকে। এমন সময় অনেক মানুষের কন্ঠস্বর শোনা গেল। সবুজ পাতার আড়ালে লুকাবে। সাবধানে ওদের মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। অভিযাত্রিক কিন্তু এখন মানুষ দেখেনি। তাই সে মাথা বাড়িয়ে দেখতে চাইলো।
“এই দেখ একটা ছোট্ট ব্যাঙ।”, বলে একজন তাকে দুহাতে নিয়ে নিল। এই বড় প্রানীগুলোই তাহলে মানুষ এরা দুপায়ে চলে। এরা তো দলবেঁধে চলছে।
একজন বললো, “না এত ছোট ব্যাঙ দিয়ে চলবে না।” বলে সে তাকে নালার ধারে ছেড়ে দিল।
সে ঝোপের ধারে এসে দেখে কুনো মাথা চাপড়ে হায় হায় করছে। “এখনও তুমি বেঁচে আছ। আমি তো ভাবলাম তোমাকেই ওরা বোয়াল মাছের চারা বানাবে? ভাগিস্য তুমি ছোট বলে বেঁচে গেছ। তবে এরপর থেকে সাবধান।”
আকাশের দিকে তাকিয়ে অভিযাত্রিক দেখে মেঘ জমে আসছে। তারা দুজনেই দেখে সামনে একটা ব্যাঙের ছাতা। তার নীচে এসে দুজনেই আশ্রয় নেয় বৃষ্টি কমলে তারা নালা দিয়ে পাড়ি দেবে। নালার ওপারে জঙ্গল। এখানে জঙ্গলটা পাতলা। ওই যে দেখা যায় বটগাছ। গাছের নীচে আসতেই ছানাপোনা সহ কুনোর চাচাতো ভাইয়ের মামাতো ভাইয়ের বউ তার ছেলে মেয়ে নাতি নাতনী বের হয়ে এলে।”
“শোন সামনের বাঁকে গিয়ে ডানে নালা। গেলে পাবে একটা নদী সেই নদীই গিয়ে মিশেছে নমুদ্রের ধারে। তবে নদীর মোহনায় গেলে তুমি কিন্তু আর সাঁতার কাটতে পারবে না। ওই নদীতেও কিন্তু বড় মাছ আছে। তবে তোমাকে জানিয়ে রাখি। তোমার শরীরে একটা বিষ থলি আছে। প্রয়োজন পড়লে ওটা ব্যবহার কর।”
“এখন থেকে বন্ধু তোমাকে একাই যেতে হবে।”, বিদায় বলে হাত নাড়ালো কুনো।
গাছটা পার হয়ে আরেকটু সামনে যেতেই চোখে পড়লো নালা। নালার সুন্দর চল ধরে সে চলল স্রোতে ভেসে ভেসে।
সামনে পড়লো কতগুলো চিংড়ি মাছ। তাদের সে শুধালো সমুদ্রের পথ।
“আহ ষাঁড়ের মতো চেঁচিও না।”, একজন চিংড়ি বলে উঠলো।
“তুমি তো কখনই ষাঁড়ের কনন্ঠস্বর শোননি।”, আরেকজন বললো।
“তা শুনিনি তা বলে এটা জানি কেউ যদি জোরে চেঁচায় তাহলে তাকে ষাঁড়ের মতো চেঁচানো বলে।”, চিংড়ির জবাব।
আরেকজন বললো, “ওর কথা শুনে রাগ করো না। ও নোন জলের চিংড়ি। মিঠে পানিতে এসেও ওর মেজাজটা মিষ্টি হলো না। এই যে নালা এটার শেষ মাথায় গেলেই দেখবো নালাটা নদীতে মিশে গেছে। সেই নদীর শেষ মাথায় আছে সমুদ্র। তবে তুমি নদীর খাড়িতে যাবার আগেই দেখবে নাকে নোনা গন্ধ আসবে। সমুদ্রের নোনা জল এসে মিশেছে সেখানেই এরপর তোমাকে পাড়ে উঠে হেঁটে হেঁটে যেতে হবে সামনে। দেখবে পাড় উঁচু হয়ে আসছে। সেই উঁচু পাড়ের শেষ মাথায় গেলেই দেখতে পাবে নীচে নীল জলরাশি। ওটাই সমুদ্র।”
নালার জল শেষে যখন সে নদীর মধ্যে এল তখন গভীর রাত। সে ভাবলো, আর পারা যাচ্ছে না একটু জিরিয়ে নেই। এখন কুয়োতে কি হচ্ছে ? ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে স্বপন দেখলো, কচ্ছপটা তাকে বলছে এসো বন্ধু। আমি এখন পাকাপাকি ভাবে কুয়োতে বসবাস করতে এসেছি। বুড়ো সব ব্যাঙেরা বলছে না না ও এখানে থাকলে ঝামেলা হবে। এ কথা শুনে কচ্ছপটা আবার কুয়োর গায়ে উঠে দিল এক লাফ। কুয়োর জল কেঁপে উঠল। তাতে ভেসে গেল ব্যাঙ। ঘুম ভেঙ্গে গেল ব্যাঙের।
“সামাল সামাল নদীতে জোয়ার এসেছে।”, কতগুলো মাছ চেঁচিয়ে উঠেছে।
“সমুদ্রে যেতে চাই।”, সে মাছদের বললো।
“পানির টানের সঙ্গে মিশে যাও। যখন ভাটার টান আসবে নদীর পানি সমুদ্রে যেতে থাকবে।”, মাছেরা বুদ্ধি দিলো অভিযাত্রিককে।
কথামতো স্রোতের সঙ্গে মিশে ভেসে যেতে থাকলো অভিযাত্রিক।
“সামাল সামাল প্রাণ বাঁচাও।”, দূর থেকে সেই ছোটমাছদের চিৎকার শুনে তাকিয়ে দেখে একটা বোয়াল হা করে তার দিকে ধেয়ে আসছে। এই ছুয়ে ফেললো প্রায়। এমন সময় সে ছুড়ে দিল তার বিষ থলি। বোয়াল মাছটার যদি হাত থাকতো তাহলে সারা গা সে চুলকে নিত। বোয়াল মাছটার কি জ্বলুনি। একি তার নি:শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
এই সুযোগে সে এবার পাড়ে ওঠে গেল । একবুক তাজা বাতাস নিল তার বুকে। তাহলে সমুদ্রের কাছে চলে এসেছি। দেথে নদীর পাড় বেশ খাড়া। থপথপিয়ে লাফিয়ে সে উঠলো খাড়া পাহাড়ে। ঘন ঘাসের জঙ্গল ধরে সে সামনে এগুতে লাগলো। দূরে দেখা যাচ্ছে ছোটখাট জঙ্গল। এগিয়ে যাচ্ছে কুয়োর ব্যাঙ। সামনে হচ্ছে সবুজ ঘাসের বোন পাতলা হয়ে আসছে। টুই টুই একটা পাখী। উড়ে আসছে তার দিকে। সমুদ্রের খুব কাছে এসেই কি সে মারা পড়বে। লাফাতে শুরু করলো সে। একবার তার গায়ে ডানা লেগে গেল প্রায়। যদি সে ঘুরে না দাঁড়াতো তাহলে এতক্ষণ চলে যেতে হতে পাখীর পেটে। পাখীটা আবার উড়ে আসছে আরো জোরে। একি সামনে বিশাল খাদ মনে হচ্ছে। অভিযাত্রিক শুয়ে পড়লো মাটিতে। পাখীটা উড়ে গেল তার উপর দিয়ে। তাকে তাড়া করেছে এবার একটা ঈগল। উঠে দাঁড়াতেই সে অবাক। খাড়া পাড়ের ওপাশে অনেক নীচে নীল আর নীল। এত জল। এটাই তাহলে সমুদ্র। এবার সে শুনতে পাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন।...
এখনও আমি কান পাতলে শুনতে পাই সমুদ্রের গর্জন। চোখ বুজলেই দেখতে পাই সাগরের নীল জলরাশী। যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। স্কুলে ব্যাঙাচিদের গল্প শোনাচ্ছিল অভিযাত্রিক। কুয়োর স্কুলের শিক্ষক অভিযাত্রিক তার ছাত্রদের তৈরি করছেন। তারা তৈরি হচ্ছে মহাসমুদ্র অভিযানে যাবার জন্য।







